শ্রীপুর প্রতিনিধি, গাজীপুর:
গাজীপুরের শ্রীপুরে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামসুল হক মিলন নামের এক ব্যক্তিকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (১১ মে ২০২৬) সকালে শ্রীপুর মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হামলার ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন কথিত সুফি হুজুর নামে এক ব্যক্তি।
উগ্রবাদীদের হামলার শিকার সামসুল হক মিলন ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার সাথে জড়িত এবং অরাজনৈতিক আন্দোলন হেযবুত তওহীদের সদস্য।
জানা গেছে, রবিবার রাতে তিনি নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করেন যেখানে লেখা ছিল, “হেযবুত তওহীদ চায় আল্লাহর বিধান (কোরআন) দিয়ে সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। আমাদের কথা একটাই রাষ্ট্র সবার, হুকুম চলবে আল্লাহর। আমি গর্বিত, আমি হেযবুত তওহীদ।” এই পোস্টের জেরে পরদিন সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তার কর্মস্থলে গিয়ে রিয়াদ খান নামের লেবাসধারী এক ব্যক্তির নেতৃত্বে উগ্রবাদী একটি গোষ্ঠী তাকে হেনস্তা করে এবং সেখান থেকে বের করে দেয়।
খানিক বাদে হেনস্তাকারীরা তাকে জোরপূর্বক স্থানীয় ট্রান্সপোর্ট অফিসে নিয়ে যায়। এসময় স্থানীয় মসজিদের ইমাম আব্দুর রহমান সরকার ওরফে সুফি হুজুর দাবি করেন, মিলনকে তওবা করে হেযবুত তওহীদ ছাড়তে হবে। নইলে তাকে এলাকা থেকে বের দেয়া হবে। মিলন তার প্রতিবাদ করে বলেন, হেযবুত তওহীদ একটি ইসলামী সংগঠন, তিনি এই সংগঠন ছাড়তে রাজি নন। এসময় কথিত সুফি হুজুর হেযবুত তওহীদ সম্পর্কে বিভিন্ন মিথ্যা বক্তব্য ও বানোয়াট হ্যান্ডবিলের মাধ্যমে উপস্থিত লোকজনকে ক্ষিপ্ত করে তোলার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তারই নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল মিলনের উপর হামলে পরে এবং বেপরোয়াভাবে তাকে পেটাতে শুরু করে। এতে মিলন মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তার শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেতলে যায় ও নিলা-ফুলা যখম হয়।
পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে শ্রীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন।
হেযবুত তওহীদের গাজীপুর জেলা আমির আবু রায়হান বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্য করছি একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী বেনামে হ্যান্ডবিল রচনা করে মিথ্যাচার করে, গুজব ছড়িয়ে মব সৃষ্টির পায়তারা করে আসছিল। সহিংসতার প্লট তৈরি করছিল তারা। আমরা প্রশাসনকে একাধিকবার জানিয়েছি বিষয়টি। সেই গোষ্ঠীটির ইন্ধনেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, মবের সংস্কৃতি আর কাম্য নয়। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর বড় গলায় বলেছে আর মব হবে না। কিন্তু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর আস্ফালন কমছে না। তারা সহিংসতা চালিয়েই যাচ্ছে। সরকার ও প্রশাসনের নিকট দাবি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ঘটনার সাথে জড়িত ও এর পেছনের ইন্ধনদাতাদের গ্রেফতার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।
হামলার বিষয়ে ভুক্তভোগী সামসুল হক মিলন বলেন, “আমি শুধু আমার বিশ্বাসের কথা ফেসবুকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা যেভাবে আমাকে মসজিদে নিয়ে গিয়ে পশুর মতো মারধর করল তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ধর্ম রক্ষার নামে তারা যে ধরনের আচরণ আমার সাথে করেছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” -বলেন তিনি।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সামসুল হক। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি এ দেশের নাগরিক। আমি যদি কোনো অপরাধ করেও থাকি তাহলে আইনিভাবে আমার বিচার হবে। কোনো অন্যায় না করার পরও শুধু শুধু বিনা অপরাধে তারা কেন আমাকে মারল? উক্ত ঘটনার সাথে জড়িত কথিত সুফি হুজুরসহ সকলের বিচার দাবি করেন তিনি।
এদিকে এই ঘটনায় স্থানীয়ভাবে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য। আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার পক্ষে রাতে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সকালে ধর্মের লেবাসধারীদের হাতে একজন সাধারণ মানুষকে আক্রমণের শিকার হতে হবে, এমনটা মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসী। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
এই ঘটনায় তথাকথিত সুফি হুজুর আব্দুর রহমান সরকার সহ জড়িত অন্যদেরকে অভিযুক্ত করে শ্রীপুর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী মিলন। তিনি অভিযুক্তদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।