অন্তর্বর্তী সরকারের পথ পেরিয়ে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০ মাস পর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের যাত্রা শুরু হয়েছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে প্রবীণ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন।
সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তারেক রহমান এই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে প্রবেশ করেন।
অধিবেশন শুরুতে সংসদ সচিবালায়ের সচিব কানিজ মাওলা কার্যক্রমের সূচনা করেন। তারপর বেলা ১১টা ৫ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। এরপর সূচনা বক্তব্য রাখেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি একাত্তর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আন্দোলন– সংগ্রামে সব শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
তারেক রহমান বলেন, “দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তিনি আপস করেননি।”
তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতিও শ্রদ্ধা জানান।
তারেক রহমান বলেন, দেশে কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। দল–মত নির্বিশেষে তিনি দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করাই বিএনপির লক্ষ্য।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ায় কোনো বিরোধ থাকতে পারে না এবং বিরোধ নেই বলেওই মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী । স্বনির্ভর বংলাদেশ গড়ায় এ সময় তিনি সবার সহযোগিতা চান।
সংসদ নেতাসহ অধিবেশন কক্ষ যখন ভরপুর সেই সময়টিতে স্পিকারের চেয়ার ফাঁকা ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশন বলে স্পিকারের চেয়ারের পাশে রাখা হয় রাষ্ট্রপতির চেয়ার।
সংসদ নেতা তারেক রহমান দাঁড়িয়ে সংসদ অধিবেশনকে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসনকে সভাপতি হিসেবে নাম প্রস্তাব করেন।
তারেক রহমানের প্রস্তাবে বিএনপির মহাসচিব, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণ সমর্থন জানান।
এরপর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাবকে সমর্থন জানান।
তিনি বলেন, “আমরা এই নামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। তবে প্রস্তাবটি নিয়ে আগে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো হত।”
সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তাতে সায় দিলে সরকারির দলের প্রথম সারি থেকে খন্দকার মোশাররফ হোসেন উঠে যান। এরপর অধিবেশ কক্ষ থেকে বের হয়ে হুইল চেয়ারে করে অধিবেশনের সভাপতিত্বে করতে চতুর্থ তলায় যান তিনি। এই সময়ে সভাপতির আগমন বার্তা ঘোষণা করা হয়।
বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে স্পিকারের খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্পিকার আসনে বসার পর সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিবাদন জানান।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
জাতীয় সংসদে স্পিকার পদে নির্বাচনের জন্য একটিমাত্র মনোনয়ন পেয়েছেন বলে সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান। তিনি হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি এই দায়িত্বপালনে সম্মত আছেন বলে জানিয়েছেন সভাপতি।
তিনি প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য বরগুনার সসংদের প্রধান হুইপ সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনি প্রতি আহ্বান জানান। তিনি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাব সমর্থন করেন খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম।
প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করা হয়। এতে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “সর্বসম্মতিক্রমে ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশনের স্পিকার নির্বাচিত হলেন ভোলা ৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ।“”
এরপর আসে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পালা।
এই পদে একটিমাত্র মনোনয়ন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি হলেন নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল। তিনি এই দায়িত্বপালনে সম্মত বলে জানিয়েছেন সভাপতি।
তিনি প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য সংসদের হুইপ নাটোর-২ আসনে সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদারকে আহ্বান জানান। প্রস্তাব সমর্থন করেন হুইপ লক্ষীপুর-৪ আসনের সাংসদ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান।
প্রস্তাবটি সংসদে পেশ করা হয়। এতে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “সর্বসম্মতিক্রমে ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশনের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হলেন সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল।”
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হেসেন অধিবেশন আধা ঘন্টার জন্য মূলতবি করেন অধিবেশন থেকে সালাম জানিয়ে বিদায় নেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের আগে সবশেষ সংসদ অধিবেশন শেষ হয়ে ২০২৪ সালের ৩ জুলাই। সেটি ছিল বাজেট অধিবেশন, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন ও পাস করা হয়। ৩০ জুন বাজেট বাজেট পাসের পর ৩ জুলাই ওই অধিবেশন শেষ হয়।
এরপর ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কাজ এগিয়ে নেওয়ার পর ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আয়োজন করে। ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন ১৭ ফেব্রুয়ারি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতাবলে এ অধিবেশন আহ্বান করেন। সংসদ সচিবালয় পরে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচি প্রকাশ করে।
এটি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন হওয়ার পাশাপাশি ২০২৬ সালেরও প্রথম অধিবেশন। সংসদীয় রীতিতে বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। পরে সেই ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব ও আলোচনা হয়।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের প্রকাশ করা দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী, বৈঠকের শুরুতেই থাকবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন। এরপর সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন এবং শোক প্রস্তাব নেওয়া হবে।
এরপর উপস্থাপন পর্বে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করবেন।