ওয়াজ মাহফিলের নামে নোয়াখালীতে হেফাজতে ইসলামের উসকানিমূলক সমাবেশ আয়োজন, অনবরত মিথ্যাচার ও ধারাবাহিক হুমকির প্রতিবাদে আজ শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) এক সংবাদ সম্মেলন করেছে হেযবুত তওহীদ।
বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্রাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাঙ্গা সৃষ্টিকারী চক্রান্ত বন্ধ করতে এবং সংগঠনের সদস্যদের জানমালের নিরাপত্তায় সরকারের অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকা মহানগর হেযবুত তওহীদের সভাপতি ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ। এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মশিউর রহমান ও এস এম সামসুল হুদা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নোয়াখালী জিলা স্কুল মাঠে আজ সকাল থেকে একটি কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক গোষ্ঠী ওয়াজ মাহফিলের নামে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে বেআইনি ও দাঙ্গা সৃষ্টিকারী সমাবেশ করছে। হেফাজতে ইসলামের তত্ত্বাবধানে কথিত ‘জমইয়্যাতুল মাদারিসিল ক্বাওমিয়্যাহ’ এবং ‘ইসলামবিরোধী কার্যক্রম প্রতিরোধ কমিটি’র যৌথ ব্যানারে এই সমাবেশটি করা হচ্ছে।
বক্তারা বলেন, নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপারের অনুমোদনপত্রে নির্দিষ্ট কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া এবং কোনো সংগঠনের নিষিদ্ধের দাবি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যানারের লেখা ও সমাবেশের বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে আইন ও অনুমোদনের শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এটি মূলত কোনো ওয়াজ মাহফিল নয়, বরং হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও উগ্রবাদী একটি সমাবেশ।
ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ অভিযোগ করেন, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে হেযবুত তওহীদের ইমামের গ্রামের বাড়িতে অরাজকতা সৃষ্টির চক্রান্ত হিসেবে গত ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে মসজিদে মসজিদে উসকানিমূলক বয়ান দেওয়া হচ্ছে এবং উগ্র হ্যান্ডবিল প্রচার করা হচ্ছে। এই ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীটি জুমার দিনে বয়ান দিয়ে, বাজারে বাজারে হ্যান্ডবিল বিলি করে এবং স্কুল ও কলেজের তরুণদের উত্তেজিত করে এক ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এমনকি ঢাকার উত্তরায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেও উসকানিমূলক মিছিল ও হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জঘন্য ভাষায় হেযবুত তওহীদের ইমাম ও সদস্যদের উদ্দেশ্যে অশ্লীল গালিগালাজ ও হুমকি প্রদান করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে হেযবুত তওহীদের আকিদা ও বিশ্বাস নিয়ে চলমান অপপ্রচারের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। বক্তারা বলেন, হেযবুত তওহীদ আল্লাহ, নবী-রসুল, কোরআন, নামাজ ও রোজাসহ ইসলামের মৌলিক আকিদায় পূর্ণ বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তুলতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের ‘কাফের’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে এবং নিষিদ্ধের দাবি তোলা হচ্ছে।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, ইসলামের বুনিয়াদি বিষয় অর্থাৎ আল্লাহর কোনো হুকুমকে যদি কেউ অস্বীকার না করে, তবে তাকে কেউ কাফের ফতোয়া দিতে পারে না। অথচ হেযবুত তওহীদ জাতীয় ও সামগ্রিক জীবনে আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠা করার জন্যই আন্দোলন করে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের প্রকাশিত ‘আকিদা’ বইয়ের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠা নিয়ে সৃষ্ট গুজবের সত্যতা তুলে ধরা হয়। বক্তারা জানান, অপপ্রচারকারীরা একটি উসকানিমূলক হ্যান্ডবিল প্রকাশ করে দাবি করেছে যে, হেযবুত তওহীদ নাকি তাদের ‘আকিদা’ বইয়ের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছে যে ‘পৃথিবীর সকল অন্যায় ও রক্তপাতের জন্য সাহাবীরা দায়ী’। এই অভিযোগের অসারতা প্রমাণ করতে সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি ‘আকিদা’ বইয়ের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠাটি পড়ে শোনানো হয়। সেখানে দেখা যায়, উক্ত পৃষ্ঠায় মূলত মানব ইতিহাসের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বর্তমান বিশ্বের অশান্তি, হাহাকার এবং আণবিক যুদ্ধের আশঙ্কার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে সাহাবিদের নিয়ে কোনো ধরনের কটূক্তি বা কটাক্ষ করার কোনো অস্তিত্বই নেই। বক্তারা বলেন, কোনো ধরনের দলিল-প্রমাণ ছাড়াই সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে এবং কাফের ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে।
সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের বক্তারা বলেন, গতকাল হেযবুত তওহীদের ইমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম একটি লাইভ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমালোচকদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। তিনি বারবার আহ্বান জানিয়েছিলেন যে, হেযবুত তওহীদের আকিদা বা আদর্শে কোনো ভুল থাকলে তা যেন সুনির্দিষ্টভাবে ধরিয়ে দেওয়া হয়। যদি কোনো ভুল প্রমাণিত হয়, তবে তিনি লাইভ অনুষ্ঠানেই তওবা করবেন। কিন্তু সমালোচক কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক গোষ্ঠীটি কোনো ভুল তুলে ধরতে না পেরে একচেটিয়াভাবে হেযবুত তওহীদের ইমাম ও তার পরিবার নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ গালাগাল করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের সংবিধান ও আইনের কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, হেযবুত তওহীদ দেশের আইন ও সংবিধানকে পুরোপুরি শ্রদ্ধা করে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৮ ও ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে সংগঠনটির শান্তিপূর্ণ উপায়ে জনসচেতনতামূলক কাজ করার পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। বিগত ৩১ বছরে তাদের বিরুদ্ধে পাঁচ শতাধিক মিথ্যা ও সন্দেহজনক মামলা করা হলেও কোনো আদালতে তাদের একজন সদস্যও দোষী প্রমাণিত হননি, বরং সবাই বেকসুর খালাস পেয়েছেন। সুতরাং আইন অমান্য করার কোনো রেকর্ড তাদের নেই। পক্ষান্তরে যারা হেযবুত তওহীদকে নিষিদ্ধের দাবি তুলছে, তাদের পরিচালিত মাদ্রাসা ও মসজিদেই শিশু বলাৎকার, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সৃষ্টি করে শত শত মাজারে হামলার মতো ভয়াবহ ও বেআইনি কর্মকাণ্ড মহামারী আকার ধারণ করেছে। বক্তারা বলেন, নিষিদ্ধ যদি করতেই হয়, তবে এই ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে করাই যুক্তিযুক্ত ও সময়ের দাবি।
হেযবুত তওহীদের ওপর অতীতে সংঘঠিত সহিংসতার ইতিহাস তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, ২০১৬ সালে সোনাইমুড়ীর চাষীরহাটে একইভাবে সমাবেশ থেকে উসকানি দিয়ে হামলা চালিয়ে সংগঠনের দু’জন সদস্যকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল, ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল এবং মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল। এছাড়া ২০০৯ সালেও তাদের ইমামের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আটটি বাড়ি ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়। এ যাবৎ চারবার এই বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। সাম্প্রতিক উসকানি ও হুমকির কারণে সদস্যরা পুনরায় জানমালের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উগ্রবাদী বক্তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি অন্ধ সমর্থন না দিয়ে আইনের ওপর দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক গোষ্ঠীটি যদি শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামের কথা বলতে চায় তবে তাতে হেযবুত তওহীদের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু ইসলামের নামে এভাবে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে সমাজকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে তার কঠোর আইনি প্রতিকার হওয়া আবশ্যক। সংগঠনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের সত্য ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্য বিনীত অনুরোধ জানানো হয়।
