স্বামীকে হারানোর পর পাঁচ বছরের ছেলে রায়হানকে নিয়ে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নিচ্ছিলেন শান্তিনা জাহান সিমি। সেই জীবনে ভালোবাসা নিয়ে এসেছেন ফিনল্যান্ডের নাগরিক মিকাইল। ভালোবাসার টানে বাংলাদেশে এসে সিমিকে বিয়ে করেছেন তিনি। পাশাপাশি রায়হানকেও নিজের সন্তানের মতো আপন করে নিয়েছেন। দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে ঘিরে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে তৈরি হয়েছে আনন্দমুখর পরিবেশ।
ঘটনাটি জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার আওনা ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের রফিকুল ইসলামের মেয়ে সিমির প্রথম স্বামী প্রায় তিন বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর থেকে একমাত্র ছেলে রায়হানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বসবাস করছিলেন তিনি। স্বামীকে হারানোর পর একাই সন্তানকে বড় করে তুলছিলেন সিমি।
এ সময় ফিনল্যান্ডে বসবাসকারী এক আত্মীয়ের মাধ্যমে দেশটির নাগরিক সিমোলা মিকার (৩৮) সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মুঠোফোনে নিয়মিত কথাবার্তার মধ্য দিয়ে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাঁদের পরিচয় ভালোবাসার সম্পর্কে রূপ নেয়।
সিমি ও তাঁর সন্তানকে নিজের জীবনের অংশ করে নিতে গত ২ অক্টোবর বাংলাদেশে আসেন মিকাইল। পরে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ের আয়োজন করা হয়।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বাংলাদেশে আসার পর জামালপুর জজ কোর্টে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন মিকাইল। পরে ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে নিবন্ধিত কাজির মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা দেনমোহরে সিমির সঙ্গে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়।
এই বিয়ের মধ্য দিয়ে সিমি ও মিকাইলের জীবনে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। একই সঙ্গে বাবাকে হারানোর পর ছোট্ট রায়হানের জীবনেও নতুন করে বাবার স্নেহ ও ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সিমি ও মিকাইল জানিয়েছেন, আগামী ১৮ অক্টোবর ফিনল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে মিকাইলের। সেখানে গিয়ে সিমি ও তাঁর সন্তানের ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁদের ইউরোপে নিয়ে যেতে চান তিনি। তবে তাঁদের ভিসা ও সেখানে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কত সময় লাগবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

এদিকে, তাঁদের বিয়ের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে এসে বিয়ে করেছেন—এমন খবর শুনে নবদম্পতিকে দেখতে অনেকেই ভিড় করেন। পুরো ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় রাব্বি নামের এক যুবক জানান, এলাকায় একজন বিদেশি যুবক বিয়ে করতে এসেছেন শুনে তাঁকে দেখতে অনেকেই ছুটে আসেন। তাঁর মতে, ভালোবাসার টানে শুধু বাংলাদেশের মেয়েরাই বিদেশে যান না, বিদেশিরাও জীবনসঙ্গীর খোঁজে বাংলাদেশে আসেন।
নিজের নতুন জীবন নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সিমি বলেন, একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, জীবন বুঝি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু মিকাইল তাঁকে ও তাঁর সন্তানকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছেন। তাঁকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে তিনি আনন্দিত। তাঁর মনে হচ্ছে, জীবনে আবারও সুখ ফিরে এসেছে।
সিমির ভাষায়, ভালোবাসার ক্ষেত্রে ভাষা কোনো বাধা নয়; মনের অনুভূতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা দুজন একে অপরকে পেয়ে সুখী। সবচেয়ে বড় বিষয়, মিকাইল তাঁর ছেলেকে নিজের সন্তানের মতো আপন করে নিয়েছেন এবং ভালোবাসছেন।
মেয়ের নতুন জীবন নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন বাবা রফিকুল ইসলামও। তিনি জানান, মেয়ের জীবনের নতুন অধ্যায় নিয়ে তিনি খুশি। দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়েটি সম্পন্ন হয়েছে। মেয়ে, জামাতা ও নাতি যেন সারা জীবন সুখে-শান্তিতে থাকেন, সে জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে জেনেছেন। তবে এ বিষয়ে থানায় এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য বা লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি।
অন্যদিকে, শিশু রায়হানের বয়স কম হওয়ায় নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ এখনো সীমিত। তার ভবিষ্যৎ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কথা বিবেচনা করে মা সিমি তাকে ক্যামেরার সামনে আনতে সম্মতি দেননি।
