ভয়াবহ ভূমিকম্পে চারপাশে ধ্বংসস্তূপ, কোথাও রাস্তা বন্ধ, কোথাও বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি। এর মধ্যেই খাবার ও পানি ছাড়া টানা ৭২ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন ৮৪ বছর বয়সী পলিনা পোবি। শেষ পর্যন্ত ভূমিকম্পের চতুর্থ দিনে স্বজনরা তাকে জীবিত উদ্ধার করেন। স্থানীয় কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে প্রায় ‘অলৌকিক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলের ফ্লোরেস দ্বীপে গত ১৫ আগস্ট সকালে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি অন্তত ৭৩ জন নিহত এবং ৯০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ।
ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট ভূমিধসে নিতুংলিয়া গ্রামের বিভিন্ন সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। ধসে পড়ে পলিনা পোবির বাঁশের তৈরি ঘরটিও। তিনি সেই ঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন।
বৃদ্ধা পলিনা আগে থেকেই পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ছিলেন। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ার পর তিনি নড়াচড়া কিংবা কথা বলতে পারছিলেন না। এ কারণে পরিবারের সদস্যদের পক্ষেও তাকে দ্রুত খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি।
এভাবেই কয়েক দিন খাবার ও পানি ছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে থাকেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার, অর্থাৎ ভূমিকম্পের চতুর্থ দিনে স্বজনরা তাকে খুঁজে পান এবং নিরাপদে উদ্ধার করেন।
সিক্কা রিজেন্সি পুলিশের কর্মকর্তা বামবাং সুপেনো জানান, পলিনা পোবিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করার পর চিকিৎসার জন্য স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় কর্মকর্তা রুডলফুস রিবা জানান, কয়েক দিন ধরে খাবার ও পানি না পাওয়ায় বৃদ্ধা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তবে তার শরীরে কোনো গুরুতর আঘাত পাওয়া যায়নি। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ায় তিনি নড়াচড়া বা কথা বলতে না পারার কারণেই এত দিন পরিবারের সদস্যদের নজরের বাইরে ছিলেন।
রুডলফুস রিবার ভাষায়, এত দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকার পরও পলিনা পোবিকে জীবিত উদ্ধার করা প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনা।
এদিকে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লোরেস দ্বীপে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে শুরু করেছে। বিভিন্ন মুদি দোকান, পেট্রল স্টেশন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আবার খুলতে শুরু করেছে। তবে এখনো অনেক এলাকায় রাস্তাজুড়ে ধ্বংসাবশেষ পড়ে রয়েছে এবং সম্ভাব্য হতাহতদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে।
ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খাবার, তাঁবু, আশ্রয়কেন্দ্রের সরঞ্জামসহ মোট ৩৯৮ টন ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও দুর্গতদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
তবে দুর্যোগের পরও আতঙ্ক কাটেনি স্থানীয়দের মধ্যে। ভূমিকম্পের পর তিন হাজারের বেশি আফটারশক বা অনুকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে অনেক মানুষ নিজেদের ঘরে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন এবং বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে থাকছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ভূমিকম্পে বাস্তুচ্যুত মানুষ শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও চরম বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন। একের পর এক আফটারশকের কারণে তাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত হওয়ায় ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। এবারের ভূমিকম্পেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে সেই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই ৭২ ঘণ্টা পর ৮৪ বছরের পলিনা পোবিকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে।
