পদ-পদবি কিংবা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কখনো কখনো মানুষের ভেতরের মানবিক অনুভূতিকে ঢেকে রাখতে পারে না। বরং অসহায় কোনো মানুষের কান্না সেই আবরণ সরিয়ে সামনে নিয়ে আসে মমতার প্রকৃত রূপ। নেপালের মহিলা, শিশু ও প্রবীণ নাগরিক বিষয়ক মন্ত্রী সীতা বাদির একটি মানবিক কর্মকাণ্ড যেন সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দিল। রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি শিশু হোম পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষুধার্ত ১৭ দিন বয়সী এক শিশুর কান্না শুনে নিজেই তাকে কোলে তুলে নিয়ে স্তন্যপান করান তিনি।
সম্প্রতি ওই শিশু হোমের চরম অব্যবস্থাপনা, নোংরা বিছানা এবং বৃষ্টির পানির মধ্যে শিশুদের বসবাসের খবর পেয়ে সেখানে পরিদর্শনে যান মন্ত্রী সীতা বাদি। হোমটিতে বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুদের রাখা হয়। পরিদর্শনের সময় তিনি দেখতে পান, সেখানে থাকা অধিকাংশ শিশুই নানা রোগে আক্রান্ত এবং তাদের জীবনযাপনও অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে ১৭ দিন বয়সী একটি শিশুকন্যা ক্ষুধার জ্বালায় একটানা কাঁদতে শুরু করে। শিশুটিকে শান্ত করার চেষ্টা করা হলেও হোমে তখন বিকল্প কোনো দুধের ব্যবস্থা ছিল না। শিশুটির কান্না শুনে আর স্থির থাকতে পারেননি মন্ত্রী।
কোনো ধরনের দ্বিধা না করে তিনি শিশুটিকে কোলে তুলে নেন। এরপর হোমের নোংরা বিছানাতেই বসে শিশুটিকে নিজের বুকের দুধ পান করান। মায়ের স্নেহের স্পর্শ পেয়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে শিশুটি। একপর্যায়ে মন্ত্রীর কোলেই ঘুমিয়ে পড়ে সে।
ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক প্রশংসা পাচ্ছেন সীতা বাদি। অনেকেই বলছেন, একজন মন্ত্রীর এমন মানবিক আচরণ শুধু আবেগের বিষয় নয়, বরং অসহায় শিশুদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
পরে আবেগাপ্লুত হয়ে মন্ত্রী সীতা বাদি জানান, শিশুটিকে কোলে নেওয়ার পর তার নিজের সন্তান বলেই মনে হয়েছে। তিনি বলেন, এখন থেকে শিশুটির মায়ের দায়িত্বও তিনি পালন করবেন।
সীতা বাদির এই মানবিকতার পেছনে রয়েছে তার নিজের জীবনেরও এক আবেগঘন অধ্যায়। তিনিও একসময় এমন একটি শিশু হোমেই বড় হয়েছেন। মাত্র ১২ বছর বয়স পর্যন্ত হোমে থেকে লেখাপড়া করেছেন তিনি। সেই হোম থেকে উঠে এসে আজ তিনি নেপাল সরকারের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
নিজের অতীতের সঙ্গে যেন সেই শিশুদের জীবনকে মিলিয়ে দেখেছেন সীতা বাদি। তাই দায়িত্ব পালনের সময় শুধু একজন মন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন মায়ের মতো করেই অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
হোমে থাকা ১৫ দিন থেকে দুই বছর বয়সী অন্তত ২০ শিশুর সার্বিক যত্ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি হোমটির পরিবেশ নতুন করে সাজানোর নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। শিশুদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিচর্যায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
একজন মন্ত্রীর পদমর্যাদার বাইরে গিয়ে অসহায় একটি শিশুর কান্নায় সাড়া দেওয়ার এই ঘটনা ইতোমধ্যে মানুষের মধ্যে আবেগ তৈরি করেছে। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি শিশুকে স্তন্যপান করানোর ঘটনা নয়; বরং ক্ষমতার আসনে থেকেও মানবিকতা ও মাতৃত্ববোধকে সবার ওপরে রাখার এক বিরল দৃষ্টান্ত।
