রাজশাহীতে এক নারীকে সঙ্গে নিয়ে ফ্ল্যাটে অবস্থান করা সাবেক এক ওসিকে ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। খবর পেয়ে নওগাঁ থেকে সেখানে ছুটে আসেন ওই পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক নারী। প্রায় দুই ঘণ্টা দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে দরজা খোলা হয়নি। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন এবং ভেতরে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ নামের এক নারীকে থানায় নিয়ে যান।
শুক্রবার সকালে নগরীর চন্দ্রিমা থানার নাদের হাজির মোড়সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
মাহবুব আলম ২০২৪ সালে চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সে সময় এক ব্যক্তির কাছ থেকে খাম নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাঁকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে তিনি নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এরপর তাঁকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাহবুব আলম কোনো ছুটি বা অনুমতি না নিয়েই রাজশাহীতে এসেছিলেন।
জানা গেছে, মাহবুব আলমের একজন পালিত মেয়ে রয়েছেন। ওই মেয়ে ও তাঁর স্বামী নাদের হাজির মোড়ের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। বৃহস্পতিবার রাত থেকে ওই ফ্ল্যাটে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ নামের এক নারী অবস্থান করছিলেন।
সানজিদা মৌ মাহবুব আলমকে নিজের স্বামী বলে দাবি করেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের বাইরে অবস্থান নেওয়া আন্নি আক্তার নিজেকে মাহবুব আলমের ষষ্ঠ স্ত্রী বলে দাবি করেন। তবে মাহবুব আলমের দাবি, চার দিন আগে তিনি আন্নিকে তালাক দিয়েছেন।
আন্নি আক্তারের বাড়ি নওগাঁ। তিনি নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর। শুক্রবার চন্দ্রিমা থানায় সাংবাদিকদের কাছে তিনি দাবি করেন, মাহবুব আলম যে জেলায় যান, সেখানেই বিয়ে করেন। একাধিক নারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আন্নি জানান, চলতি বছরের শুরুতে মাহবুব আলম তাঁকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তাঁর স্বামীর বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারেন তিনি। রাজশাহী নগরের পদ্মা আবাসিক এলাকায় মাহবুব আলমের একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও জানান আন্নি। এর আগে ওই ফ্ল্যাটে সানজিদা মৌয়ের সঙ্গে মাহবুব আলমকে দুই দিন দেখেছিলেন তিনি। তখন মান-সম্মানের কথা ভেবে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলেননি বলে জানান।
আন্নির ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি খবর পান মাহবুব আলম তাঁর পালিত মেয়ের ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটে এসেছেন এবং সেখানে সানজিদা মৌও রয়েছেন। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে তিনি সেখানে পৌঁছে দরজায় ডাকাডাকি করেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও দরজা না খোলায় তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন।
আন্নির অভিযোগ, পরে চন্দ্রিমা থানা থেকে পুলিশ সেখানে গেলেও ভেতরে মাহবুব আলম রয়েছেন জানতে পেরে তারা দরজা ভাঙেনি। এরপর তিনি ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন।
আন্নি বলেন, দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে রেখেছিলেন। পুলিশ ফোন করে দরজা খুলতে বললেও তারা দরজা খোলেননি। পরে দরজা ভাঙার পর মাহবুব আলম সানজিদাকে তাঁর স্ত্রী বলে দাবি করেন।
মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। সানজিদা কোনো মন্তব্য করেননি। মাহবুব আলম বলেন, তিনি আন্নি আক্তারকে তালাক দিয়েছেন এবং সানজিদা তাঁর স্ত্রী। পুলিশের কাছে আন্নিকে তালাক দেওয়ার কাগজ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। তবে সানজিদার সঙ্গে বিয়ের কাবিননামা তিনি দেখাতে পারেননি।
পুলিশ জানিয়েছে, চার দিন আগে আন্নি আক্তারকে তালাক দেওয়ার একটি কাগজ মাহবুব আলম দিয়েছেন। তবে আন্নির দাবি, তিনি তালাকের কোনো কাগজ পাননি।
এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আন্নি আক্তার। শুক্রবার দুপুরে অভিযোগ লেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে থানার আলাদা দুটি কক্ষে রাখা হয়। ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবিও জানান আন্নি।
চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ছুটিতে থাকায় শুক্রবার দুপুরে থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদ সিদ্দিকী বলেন, ‘মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌয়ের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় আসবেন। এরপর সিদ্ধান্ত হবে।’
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ বলেন, মাহবুব আলমের কোনো ছুটি নেই। কাউকে জানিয়েও তিনি রাজশিয়ায় যাননি। তাঁর ভাষ্য, বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করাও একটি অপরাধ।
তিনি আরও জানান, মাহবুব আলম ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত থাকলেও নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত। বিষয়টি নওগাঁ জেলা পুলিশকে জানানো হয়েছে এবং তারা এ বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।
