ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার দুই যমজ বোনের একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যজনকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১৯ বছর বয়সী তারানেহ রহিমি ও তার যমজ বোন রোমিনা রহিমি গত জানুয়ারিতে ইসফাহানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তারের পর তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার প্রায় এক মাস পর গভীর রাতে মুখোশ পরা কয়েকজন ব্যক্তি তাদের বাড়িতে ঢুকে দুই বোনকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে পরিবার জানতে পারে, ওই ব্যক্তিরা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) পাঠানো সদস্য ছিলেন।
দুই বোনকে তুলে নেওয়ার পর প্রায় চার মাস তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতে পারেনি পরিবার। তাদের মা মারজিয়ে নুরমোহাম্মাদি বিভিন্ন হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিতে থাকেন। পরে মে মাসে তিনি জানতে পারেন, তার দুই মেয়ে ইসফাহানের দৌলতাবাদ কারাগারে রয়েছেন।
পরিবারের দাবি, কারাগারে মেয়েদের দেখতে গিয়ে তাদের মা শারীরিকভাবে গুরুতর আহত অবস্থায় দেখতে পান। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী তাদের চাচাতো ভাই মাসুদ নুরমোহাম্মাদি অভিযোগ করেন, দুই বোনের মাথার চুল ধরে টেনে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া হয়েছিল। এতে তাদের মাথার বিভিন্ন অংশের চুল উঠে যায় এবং মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
নুরমোহাম্মাদির আরও দাবি, কারাগারে তারানেহকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল—স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর না করলে তার বোন রোমিনাকে তার সামনেই ধর্ষণ করা হবে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তারানেহ রহিমিকে মৃত্যুদণ্ড এবং রোমিনা রহিমিকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে দুই বোনের সাজায় এত বড় পার্থক্যের কারণ কী, তা স্পষ্ট নয়। রায় ঘোষণার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা তাদের সঙ্গে আর দেখা করতে পারেননি বলে জানা গেছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারানেহ আদালতে দাবি করেছেন, তার কাছ থেকে নেওয়া স্বীকারোক্তি নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছিল। তাদের আইনজীবীদের ভাষ্যও একই ধরনের অভিযোগের কথা তুলে ধরেছে।
পরিবার আরও দাবি করেছে, দুই বোন বিক্ষোভের সময় কোনো সহিংসতায় জড়িত ছিলেন—এমন প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আগে তারা কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও অংশ নেননি বলে দাবি পরিবারের।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, চলতি বছর ইরানে এখন পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অন্তত ২৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১৬ জন নারী।
এ ছাড়া শত শত বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে অথবা এমন অভিযোগে বিচার করা হচ্ছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। ইসফাহানেই এ ধরনের অভিযোগে ৭০ জনের বেশি মানুষ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত মাসে যুক্তরাজ্যসহ ৩০টি দেশ জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দেয়। এতে এসব মৃত্যুদণ্ডকে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তারানেহ ও রোমিনা ৮ ও ৯ জানুয়ারি ইসফাহানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর প্রায় এক মাস পর তাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ সময় তাদের অবস্থান গোপন রাখার পর পরিবারকে জানানো হয়, তারা কারাগারে রয়েছেন।
দুই মেয়েকে কারাগারে দেখে তাদের মা প্রথমে চিনতেই পারেননি বলে জানান নুরমোহাম্মাদি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই বোনের মুখ ফুলে গিয়েছিল এবং কনুই, হাতের আঙুল ও পায়ে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাদের চুলও টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে তারা একাকী কারাবাসেও ছিলেন বলে জানা যায়।
মারজিয়ে নুরমোহাম্মাদি একাই দুই মেয়েকে বড় করেছেন। পরিবারের দাবি, মেয়েদের বিচারেও তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী আত্মীয়ের সঙ্গে রয়েছেন।
নুরমোহাম্মাদি জানান, মামলার বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের প্রকাশ্যে কথা বলার কারণে তাকে মুঠোফোনের বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুর হুমকিও দেওয়া হয়েছে। মেয়েদের কথা মনে পড়লেই তার মা কান্নায় ভেঙে পড়েন বলেও জানান তিনি।
