নেছারাবাদ (পিরোজপুর) প্রতিনিধিঃ
নথিতে শিক্ষার্থী ১২০ জন, শিক্ষক ১১ জন এবং কর্মচারী দুইজন। কিন্তু বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানের সময় সরেজমিনে পাওয়া গেল মাত্র ৭ জন শিক্ষার্থী। আর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলও বলছে আরও ভয়াবহ চিত্র—২০২৬ সালে ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন। আগের বছরও ৮ জনের মধ্যে পাস করেছিল একজন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কাগজে-কলমে ১২০ শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে তাদের অধিকাংশ কোথায়?
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার মৈশানী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিল একজন শিক্ষার্থী। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি। নবম ও দশম শ্রেণিতে ছিল তিনজন করে। সব মিলিয়ে উপস্থিত মাত্র সাতজন।
বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১২০ জন। তাদের পাঠদানের জন্য রয়েছেন ১১ জন শিক্ষক ও দুইজন কর্মচারী। অথচ এসএসসি ফলাফলে ধারাবাহিকভাবে দেখা যাচ্ছে চরম বিপর্যয়।
২০২৬ সালে বিদ্যালয়টি থেকে ১১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র একজন। ফেল করেছে ১০ জন। এর আগের বছর ৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল মাত্র একজন।
অর্থাৎ দুই বছরে মোট ১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র দুজন।
এমন ফলাফল ও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির চিত্র নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে শিক্ষা কার্যক্রম, ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পঙ্কজ কুমার মণ্ডল শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার জন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, পরিবারে সন্তান সংখ্যা কমে যাওয়া এবং এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশকে দায়ী করেছেন।
তবে এসএসসি পরীক্ষায় এত খারাপ ফলাফলের বিষয়ে তিনি বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা পর্ষিয়া রানী হালদারও শিক্ষার্থী সংকটের পেছনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, ওয়াশরুমের সমস্যা এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এসএসসি পরীক্ষায় অন্তত ১০-১২ জন পরীক্ষার্থী দেখানো প্রয়োজন। এ কারণে পাশের সপ্তগ্রাম সম্মিলনী বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে এনে এই বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে এখানেই উঠেছে নতুন প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছর পাশের বিদ্যালয়ের ছয়জন শিক্ষার্থীকে এনে ফরম পূরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য মোট ৩৪ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা। তিনি দাবি করেছেন, টাকার পরিমাণ এত নয়।
এখন প্রশ্ন উঠছে, অন্য বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা শিক্ষার্থীদের এনে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি কীভাবে হয়েছে?
শুধু শিক্ষার্থীর উপস্থিতিই নয়, পাঠ্যবইয়ের হিসাব নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
জানা গেছে, বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ে ৬০ জন শিক্ষার্থীর চাহিদা দেখিয়ে ৬০ সেট বই নেওয়া হয়েছে। অথচ সরেজমিনে নিয়মিত উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা তার তুলনায়ও অনেক কম।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা কত? নথিতে থাকা ১২০ শিক্ষার্থীর কতজন নিয়মিত পাঠদানে অংশ নেয়? আর বইয়ের চাহিদা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে?
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী থাকার পরও তাদের একটি অংশ নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। এতে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা পর্ষিয়া রানী হালদার। তার দাবি, কোনো শিক্ষক শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে অনুপস্থিত থাকতে পারেন, অন্যথায় শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন।
বিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হলে দীর্ঘদিনেও কেন সেটির কার্যকর সমাধান হলো না? ১১ জন শিক্ষক থাকার পরও বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কেন সাত-আটজনে আটকে থাকবে?
আর যদি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকটই থাকে, তাহলে নথিতে প্রায় ১২০ শিক্ষার্থী কীভাবে রয়েছে—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা, নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি, পাঠ্যবইয়ের চাহিদা এবং অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
নেছারাবাদ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জহিরুল আলম বলেন, বিদ্যালয় থেকে ১১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একজন পাস করেছে। অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টিও তার জানা হয়েছে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে তথ্য চাওয়া হবে।
