BMBF News
প্রিমিয়াম ওয়েব হোস্টিং + ফ্রি ডোমেইন
সাথে পাচ্ছেন ফ্রি SSL এবং আনলিমিটেড ব্যান্ডউইথ!
অফারটি নিন »

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারও জাগছে সেই খনি!

বিশ্বজুড়ে একের পর এক যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই আবারও সচল হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার কিং আইল্যান্ডের ঐতিহাসিক ডলফিন টাংস্টেন খনি। গত এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এই খনির ইতিহাস যেন যুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—বিশ্বযুদ্ধ বা বড় সামরিক সংঘাতের সময় চাহিদা বাড়লে খনিটি চালু হয়েছে, আর শান্তি ফিরলে টাংস্টেনের দাম ও চাহিদা কমে আবার বন্ধ হয়েছে। এবার ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রতিযোগিতার মধ্যে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে এই খনি।

কিং আইল্যান্ডে অবস্থিত ডলফিন মাইন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টাংস্টেনের মজুত হিসেবে পরিচিত। টাংস্টেন অত্যন্ত ঘন ও শক্ত ধাতু, যার উচ্চ গলনাঙ্ক ও কঠোরতার কারণে সামরিক সরঞ্জাম, বর্ম-ভেদী গোলাবারুদ, সাঁজোয়া যান এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতেও এর ব্যবহার রয়েছে।

এই খনির ইতিহাস শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯১৭ সালে যুদ্ধের কারণে অস্ত্র ও শক্ত ধাতুর চাহিদা বেড়ে গেলে ডলফিন মাইন থেকে টাংস্টেন উত্তোলন শুরু হয়। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ১৯২০ সালের দিকে টাংস্টেনের চাহিদা ও বাজারদর কমে যাওয়ায় খনিটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর ইউরোপে আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হলে টাংস্টেনের প্রয়োজনীয়তাও বাড়তে থাকে। ১৯৩৭-৩৮ সালের দিকে ডলফিন মাইন পুনরায় চালু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় খনিটির উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। যুদ্ধের পরও কোরিয়া যুদ্ধের সময় টাংস্টেনের চাহিদা বাড়ায় খনিটি আবার গুরুত্ব পায়। পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও বিভিন্ন পর্যায়ে খনিটির কার্যক্রম চালু ছিল।

কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের অবসান এবং সামরিক চাহিদা কমে যাওয়ার পর আবারও খনিটির ভাগ্য বদলে যায়। ১৯৯০ সালে ডলফিন মাইন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে খনির খোলা অংশে পানি জমে পড়ে থাকে। দেখে মনে হয়েছিল, হয়তো এই খনির ইতিহাস এখানেই শেষ।

কিন্তু পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করে ২০২২ সালে। ওই বছরের জানুয়ারিতে খনিটি পুনরায় উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর কয়েক সপ্তাহ পরই রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনাও বাড়তে থাকে। ফলে টাংস্টেনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা খনিজের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।

এখন ২০২৬ সালে এসে ডলফিন মাইনে উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেপ্টেম্বর থেকে ভূগর্ভস্থ অংশ থেকে প্রথম আকরিক উত্তোলন ও সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। খনিটির পুনঃউন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রথমে উন্মুক্ত খনন এবং পরবর্তী সময়ে ভূগর্ভস্থ খনন কার্যক্রম পরিচালনার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এখানে ৪ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন টন ইঙ্গিতকৃত খনিজ মজুত এবং মোট সম্ভাব্য খনিজ সম্পদ প্রায় ৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন।

ডলফিন মাইনের নতুন করে গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে শুধু যুদ্ধ নয়, বৈশ্বিক খনিজ রাজনীতিও বড় কারণ। টাংস্টেনের বৈশ্বিক সরবরাহে চীনের আধিপত্য রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস তৈরির চেষ্টা করছে। বিশেষ করে সামরিক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

এই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রও বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। কাজাখস্তানের নর্দার্ন কাটপার ও আপার কাইরাকটি এলাকায় বিশ্বের অন্যতম বড় অনুন্নত টাংস্টেন সম্পদ উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক এবং ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন মিলে সর্বোচ্চ ১৬০ কোটি ডলার অর্থায়নের আগ্রহপত্র দিয়েছে। প্রকল্প দুটিতে প্রায় ১৪ লাখ টন টাংস্টেন ট্রাইঅক্সাইডের সম্পদ রয়েছে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য জানানো হয়েছে।

কাজাখস্তানের প্রকল্পটির উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ১১০ কোটি ডলার ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি প্রকল্প থেকে বছরে মোট প্রায় ১২ হাজার টন টাংস্টেন উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের ও মিত্র দেশগুলোর জন্য একটি তুলনামূলক নিরাপদ সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা।

টাংস্টেনকে শুধু অস্ত্রের ধাতু হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। অত্যন্ত শক্ত ও তাপসহনশীল হওয়ায় সামরিক শিল্পের পাশাপাশি ভারী যন্ত্রপাতি, কাটিং টুল, শিল্পকারখানার সরঞ্জাম এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার রয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতে বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবস্থায় টাংস্টেনের গুরুত্ব বেশি।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতাও এই ধাতুর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা খাতে টাংস্টেনের চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন।

এই কারণেই কিং আইল্যান্ডের ডলফিন মাইনের পুনর্জাগরণকে শুধু একটি পুরোনো খনি পুনরায় চালুর ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হওয়া নতুন প্রতিযোগিতার একটি প্রতীক হয়ে উঠছে।

এক শতাব্দীর ইতিহাসে ডলফিন মাইনের কার্যক্রম বারবার যুদ্ধ ও সামরিক চাহিদার সঙ্গে ওঠানামা করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ—প্রতিটি বড় সংঘাতের সময় টাংস্টেনের প্রয়োজন বেড়েছে। আর এখন ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার সময়ে সেই পুরোনো খনি আবারও জেগে উঠছে।

তাই ডলফিন মাইনের গল্প শুধু একটি খনির গল্প নয়; এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতিতে যুদ্ধের প্রস্তুতি যত বাড়ে, মাটির নিচে থাকা কিছু ধাতুর গুরুত্বও তত বেড়ে যায়। আর সেই তালিকায় টাংস্টেন এখন অন্যতম কৌশলগত সম্পদ।

সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট; G6 Metals; মার্কিন সরকারি নথি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সূত্র।

Pearl IT
ওয়েব ডিজাইন
গ্রাফিক্স ডিজাইন
কন্টেন্ট পাবলিশিং
এসইও সার্ভিস
অর্ডার করুন »