একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর কষ্ট হয়তো একসময় চোখের পানিতে প্রকাশ করা যায়। কিন্তু একজন মানুষ কোথায়—বেঁচে আছেন, নাকি নেই—তা না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার যন্ত্রণা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সেই অপেক্ষায় থাকে না নিশ্চিত শোক, থাকে না স্বস্তি; থাকে শুধু অনিশ্চয়তা, ভয় আর ফিরে আসার একটি ক্ষীণ আশা। বাংলাদেশের বহু পরিবার বছরের পর বছর এমনই এক অন্ধকারের মধ্যে জীবন কাটিয়েছে। আর সেই পরিবারের স্বজনদের কান্না আজও মনে করিয়ে দেয়—গুম শুধু একজন মানুষকে নিখোঁজ করে না, একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনকেও থামিয়ে দেয়।
৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি শুধু গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করার দিন নয়; এটি সেইসব মা-বাবার কান্না, স্ত্রীদের অপেক্ষা, সন্তানদের শূন্যতা এবং পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস স্মরণ করার দিন। প্রিয় মানুষটি কোথায় আছেন, কেমন আছেন কিংবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়েই অসংখ্য পরিবার বছরের পর বছর পার করেছে।
বাংলাদেশও এই নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে গুমের অভিযোগ নিয়ে দেশে-বিদেশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে।
কমিশনের কাছে জমা পড়া ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। কমিশনের সদস্যদের মতে, গুমের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
কমিশনের প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২১৫টি, ২০১৭ সালে ১৯৪টি এবং ২০১৮ সালে ১৯২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০১৯ সালে ১১৮টি, ২০২২ সালে ১১০টি এবং ২০২৩ সালে ৬৫টি গুমের ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের লক্ষ্য করে গুমের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছিলেন। এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের সংখ্যা ৬৮ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৩১২ জন নেতা-কর্মী গুমের শিকার হওয়ার তথ্যও উঠে আসে। তাদের মধ্যে ১০৭ জন আর ফিরে আসেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার, একজন মা, একজন বাবা, একজন স্ত্রী কিংবা একটি সন্তান। রয়েছে একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং বছরের পর বছর ধরে চলা অপেক্ষা।
কোনো মা হয়তো আজও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—এই বুঝি তার ছেলে ফিরে এলো। কোনো স্ত্রী হয়তো এখনো বিশ্বাস করেন, একদিন হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়বেন তার স্বামী। কোনো সন্তান হয়তো বাবার একটি ছবিকে বুকের কাছে ধরে বড় হয়েছে। বছর যায়, বছর আসে; কিন্তু মানুষটি আর ফিরে আসে না।
গুমের সবচেয়ে নির্মম দিক এখানেই। একজন মানুষ মারা গেছেন—এ কথা নিশ্চিতভাবে জানতে পারলে পরিবার হয়তো একসময় বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে শোক করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু প্রিয় মানুষটি কোথায়, কী অবস্থায় আছেন—এই প্রশ্নের উত্তর না পেলে সেই শোকেরও কোনো পরিণতি থাকে না। পরিবার একই সঙ্গে আশা ও হতাশার মধ্যে আটকে থাকে।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর ঘটনাও এমন দীর্ঘ অপেক্ষার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের সন্ধানের অপেক্ষায় থেকেছে। তাকে পাওয়া যেতে পারে—এমন আশার কথাও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ পরিণতি আজও অধরা।
এই দীর্ঘ অন্ধকারের মধ্যে গুমের শিকার পরিবারগুলোর কষ্টের কথা সরাসরি শুনেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে স্বজনদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা শুনে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে স্বজনদের কান্না ও আর্তনাদে তিনিও কান্নায় ভেঙে পড়েন। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা তাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা এবং ফিরে পাওয়ার আকুতি তুলে ধরেন।
সেদিনের কিছু কথা হয়তো সহজে ভোলার নয়। কোনো শিশু বলেছে, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি। কোনো সন্তান জানিয়েছে, বাবাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতেই পারেনি—কারণ বাবা নিখোঁজ হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস।
এই কথাগুলো শুধু একটি অনুষ্ঠানের আবেগঘন মুহূর্ত ছিল না। এগুলো ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা পরিবারের কষ্টের প্রকাশ। আর সেই কষ্ট শুনতে গিয়ে তারেক রহমানের আবেগাপ্লুত হয়ে পড়া ঘটনাটিকে আরও মানবিক মাত্রা দেয়।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর মূল দাবি খুব পরিষ্কার—তারা সত্য জানতে চান, তারা জানতে চান তাদের প্রিয়জনদের কী হয়েছিল, কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং এর জন্য কারা দায়ী। পাশাপাশি তারা চান ন্যায়বিচার।
তারেক রহমানও গুম ও খুনের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলের গুম-খুনের বিচার হওয়া প্রয়োজন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তবে এই বিচার হতে হবে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হওয়া উচিত পথ।
বর্তমান সময়ে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মাধ্যমে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুমের ফলে মৃত্যু হলে কিংবা দীর্ঘ সময় পরও ব্যক্তিকে উদ্ধার করা না গেলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
তবে শুধু আইন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, ভবিষ্যতে কোনো নাগরিককে তার রাজনৈতিক মত, পরিচয় বা অন্য কোনো কারণে বেআইনিভাবে তুলে নেওয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগও থাকা উচিত নয়।
আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাই প্রশ্নটা শুধু অতীত নিয়ে নয়; প্রশ্নটা ভবিষ্যৎ নিয়েও।
আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একটি পরিবার বছরের পর বছর একজন মানুষের অপেক্ষায় থাকবে? যেখানে কোনো মা জানবেন না তার সন্তান কোথায়, কোনো স্ত্রী জানবেন না তার স্বামী বেঁচে আছেন কি না, আর কোনো শিশু বাবার ফিরে আসার আশায় শৈশব পার করবে?
নিশ্চয়ই এমন বাংলাদেশ কেউ চায় না।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষের জীবন, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। যেখানে কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের ভাগ্য না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না। যেখানে কোনো অভিযোগ চাপা পড়ে থাকবে না এবং অপরাধী যে-ই হোক, আইনের আওতায় আসবে।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সহানুভূতি প্রকাশে শেষ হতে পারে না। তাদের সত্য জানতে হবে, ন্যায়বিচারের পথ খুলে দিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানবিক, চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
যে মা আজও দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন, তার অপেক্ষার একটি উত্তর প্রয়োজন। যে সন্তান আজও বাবার একটি স্পর্শের অপেক্ষায় আছে, তার কষ্টের স্বীকৃতি প্রয়োজন। যে স্ত্রী বছরের পর বছর প্রিয়জনের ফেরার আশায় দিন গুনছেন, তারও সত্য জানার অধিকার রয়েছে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাই অঙ্গীকার হোক—বাংলাদেশ আর কখনো গুমের অন্ধকারে ফিরে যাবে না। রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, অপরাধের বিচার হবে এবং কোনো পরিবারকে আর প্রিয়জনের ভাগ্য না জেনে অন্ধকারে অপেক্ষা করতে হবে না।
কারণ একজন মানুষ হারিয়ে গেলে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যান না—তার সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, স্বাভাবিক জীবন এবং ভবিষ্যতের অনেকটা অংশও যেন হারিয়ে যায়। সেই অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে সত্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
