রাশিয়া যদি ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, উত্তাপ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলা বন্ধ করে, তাহলে রুশ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখতে প্রস্তুত ইউক্রেন। এমন শর্তে রাশিয়ার সঙ্গে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ করতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এ কথা জানান।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট বৈঠক করেন জেলেনস্কি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি বৈঠকটিকে ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন উভয়েই শীত মৌসুম শুরুর আগেই যুদ্ধের অবসান চায়। এ লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনার পথ তৈরি করতে সম্ভাব্য উত্তেজনা কমানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইউক্রেন একতরফাভাবে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, উত্তাপ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলা বন্ধ করে, তাহলে ইউক্রেনও রাশিয়ার ডিজেল, তেল শোধনাগারসহ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখতে প্রস্তুত।
এদিকে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠকটি হয়। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন ও পরিশোধন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে ডিজেলের দামে চাপ তৈরি হচ্ছে। রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে। তবে আগের একটি জ্বালানি-সংক্রান্ত সমঝোতার পরও হামলা আবার শুরু হয়েছিল।
ক্রেমলিন এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল। একই সঙ্গে রাশিয়া সমুদ্রপথে জ্বালানি রপ্তানি এবং দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। তবে জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনীয়রা প্রতিদিন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে থাকায় রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ে এখন আলোচনা হতে পারে না।
শীত মৌসুম সামনে রেখে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী রাশিয়া ইউক্রেনে নতুন করে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিতে পারে। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর রাশিয়া প্রায় ২০০টি ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছিল বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান। এসব হামলায় কিয়েভের পেট্রোল স্টেশনসহ জ্বালানি ও বন্দর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বরের একটি হামলায় মস্কোর তেল শোধনাগারের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে।
শীতকালে সম্ভাব্য রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় জেলেনস্কি ট্রাম্পের কাছে আরও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছেন। তিনি এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজস্ব মজুত থেকে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র দিতে পারে এবং পরে জার্মানির কাছ থেকে ইউক্রেন যে ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার কথা রয়েছে, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে তা ফেরত দেওয়া হবে। জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, জার্মানির সঙ্গে ইউক্রেনের ২০২৭ ও ২০২৮ সালের সরবরাহ নিয়ে চুক্তি রয়েছে। ট্রাম্প প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেননি, তবে এখনো চূড়ান্ত সম্মতিও দেননি।
এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামও ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের উদ্যোগের পক্ষে কথা বলেছেন। পাশাপাশি ইউক্রেনের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে আরও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দূরপাল্লার হামলার মধ্যেই নতুন করে ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’র প্রস্তাব সামনে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত এটি বাস্তবায়নের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে বলে জানা যায়নি।
সূত্র: আল জাজিরা
