সাত সকালে আবারও কেঁপে উঠল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) সকাল সোয়া ৬টার দিকে অনুভূত এই ভূমিকম্পে অনেকের ঘুম ভেঙে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানান, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪.১, যা হালকা ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত। এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর শিবপুর এলাকায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইএমএসসি অবশ্য তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, ভূমিকম্পের গভীরতা ছিল ৩০ কিলোমিটার এবং উৎপত্তি টঙ্গী থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপূর্বে, নরসিংদীর খুব কাছে।
রাজধানীসহ নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানের মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝাঁকুনি অনুভবের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তারা জানান, ভোরের শান্ত পরিবেশে হঠাৎ দুলে উঠলে আতঙ্ক তৈরি হয়।
এর আগেও গত ২১ নভেম্বর ঢাকাসহ দেশের বৃহত্তর অংশে প্রবল ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। এরপর কয়েক দফা মাঝারি কম্পন হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নরসিংদী অঞ্চলে ধারাবাহিক কম্পন বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার ও সতর্ক প্রস্তুতির ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প নিয়ে ভীতি থাকলেও প্রতিবেশী জাপানে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ধরনের কম্পন অনুভূত হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে বছরে প্রায় দেড় হাজার ভূমিকম্প হয়। ইউরেশিয়ান, ফিলিপাইন ও প্যাসিফিক এই তিন টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে থাকার কারণেই জাপানে ভূমিকম্প এত ঘন ঘন ঘটে।
বাংলাদেশের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগের প্রস্তুতি ও জনসচেতনতার ক্ষেত্রে জাপান থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। জাপানে একটি শিশু জন্মের পরই ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পায়। স্কুলে নিয়মিত মহড়া হয়, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে তা সবাই জানে- পার্ক, খেলার মাঠ বা নির্দিষ্ট নিরাপদ জোন সবার জন্য চিহ্নিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ূন আখতার মনে করেন, নিয়মিত মহড়া চালু করতে বড় বাজেটের প্রয়োজন নেই; বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ জনবহুল স্থানে এসব মহড়া অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে করা উচিত। স্থপতি ইকবাল হাবিবও বলেন, বড় শহরগুলোতে নিরাপদ স্থান চিহ্নিত ও প্রচার করা জরুরি।
জাপানের ভবনগুলোর স্থিতিস্থাপকতার পেছনে রয়েছে উন্নত প্রকৌশল প্রযুক্তি। সিসমিক আইসোলেশন ব্যবস্থায় ভবনগুলোকে শক অ্যাবজরবারের ওপর নির্মাণ করা হয়, যাতে ভূমিকম্পের সময় ভবনটি কাঁপে না—দুলে ওঠে। কখনো ৩০–৫০ সেন্টিমিটার পুরু রাবারের ব্লক এসব ভবনের নিচে বসানো হয়। মোশন ড্যাম্পারের মাধ্যমে উঁচু ভবনের অতিরিক্ত নড়াচড়া কমিয়ে কাঠামোগত ক্ষতি থেকেও রক্ষা করা হয়।
তবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—ভূমিকম্প প্রস্তুতি, নিয়মিত মহড়া এবং ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা। বিশেষ করে ছোট-মাঝারি ভবনগুলোর ক্ষেত্রেও যেন ন্যূনতম নিরাপত্তা মান বজায় থাকে।
তাদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে অবকাঠামোকে নিরাপদ রাখা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশে এর বিকল্প নেই।