ওয়াশিংটনে এক গোপন বৈঠকে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে তার হুমকি বাস্তবায়ন না করেন, তবে তেহরানের সরকার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ওই বৈঠকে উপস্থিত চারটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
সৌদি আরবের প্রকাশ্য অবস্থানের ঠিক উল্টো মেরুতে এই মন্তব্য। জনসমক্ষে তারা উত্তেজনা বাড়ানোর বিপক্ষে কথা বলছিল। মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সেই সতর্কবার্তার কারণেই ট্রাম্প হামলার সিদ্ধান্ত পিছিয়েছিলেন।
এক নজরে পরিস্থিতি
সৌদি যুবরাজের ছোট ভাই এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী হলেন খালিদ বিন সালমান। ইরান নিয়ে আলোচনা করতেই তিনি ওয়াশিংটন সফরে গেছেন। এদিকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন সামরিক অভিযানের আতঙ্কে দিন গুনছে। তেহরানও হুমকি দিয়ে রেখেছে যে, তাদের জবাব হবে ‘নজিরবিহীন’।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ট্রাম্প বিশাল মার্কিন সামরিক শক্তি জড়ো করার নির্দেশ দিয়েছেন। অবশ্য হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ট্রাম্প এখনো কূটনৈতিক পথেই সমাধানের চেষ্টা করতে চান।
এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো সিরিয়াস আলোচনা চলছে না। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, আমেরিকার কঠোর শর্ত মেনে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরান আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।
উপসাগরীয় অঞ্চলের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান সব সময়ই চুক্তি করতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো কেমন চুক্তি হবে তা নিয়ে। ইরান কী ধরনের চুক্তি চায় আর আমেরিকা কোনটা মানবে? এটাই বড় প্রশ্ন। এই মুহূর্তে দুই পক্ষের মিল হওয়ার কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না।’
খবরের পেছনের খবর
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন খালিদ বিন সালমান। সেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন উপস্থিত ছিলেন। একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের মূল আলোচনার বিষয় ছিল ইরানে মার্কিন হামলার সম্ভাবনা।
প্রকাশ্য বনাম গোপন অবস্থান
সৌদি আরবের প্রকাশ্য অবস্থান বেশ সতর্ক। বুধবার ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপে যুবরাজ সালমান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানে হামলার জন্য সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এক বিবৃতিতে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং কূটনৈতিক সমাধান চায়।
তবে পর্দার আড়ালে খালিদ বিন সালমানের সুর ছিল ভিন্ন। শুক্রবার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ১৫ জন বিশেষজ্ঞ এবং পাঁচটি ইহুদি সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক ঘণ্টা বৈঠক করেন তিনি। সেখানে তিনি অনেকটা খোলামেলা কথা বলেন।
সূত্রের মতে, তিনি বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে হুমকি দেওয়ার পর ট্রাম্পকে এখন সামরিক পদক্ষেপ নিতেই হবে। তবে একই সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টাও করতে হবে।
ওই বৈঠকে খালিদ বিন সালমান বলেন, ‘এই মুহূর্তে যদি হামলা না হয়, তবে তা ইরানের সরকারকে আরও সাহসী ও বেপরোয়া করে তুলবে।’
দুটি সূত্র জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসে খালিদ বিন সালমান যে বার্তা দিয়েছিলেন, এখানেও তিনি সেটাই বলেছেন। তবে তিনি এও জানিয়েছেন, ইরান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল বা উদ্দেশ্য আসলে কী, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে তিনি বৈঠক থেকে বের হতে পারেননি।
শুক্রবার আলাদা এক ব্রিফিংয়ে উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা বলেন, পুরো অঞ্চলটি এখন এক উভয় সংকটে আটকা পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করলে ‘খারাপ ফল’ হতে পারে। আবার হামলা না করলে ‘ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে আসবে’।
কৌশলগত পরিবর্তন
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মিনতি করছিল যেন ইরানে বোমা ফেলা না হয়। তারা আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেছিল।
এই মত পরিবর্তনের একটি কারণ হতে পারে—সৌদিরা হয়তো বুঝতে পেরেছে ট্রাম্প হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন। তাই তারা এখন আর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে—এমনটা দেখাতে চাইছে না।
অন্যান্য প্রসঙ্গ
বৈঠকে উপস্থিত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, খালিদ বিন সালমান জোর দিয়ে বলেছেন সৌদি আরব ইসরায়েল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে না। অথবা মুসলিম ব্রাদারহুডের দিকেও ঝুঁকছে না।
সৌদি সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বাড়ছে—উপস্থিত সদস্যদের এমন উদ্বেগও তিনি নাকচ করে দেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন বলেন, ‘তিনি ( খালিদ বিন সালমান) বেশ কয়েকবার বলেছেন এসব বাজে কথা। তবে তিনি যতবার এ কথা বলছিলেন, ততই আমাদের কাছে বিষয়টি কম বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল।’
তথ্যসূত্র: টিবিএস