কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী ১৫৭ জন, উপবৃত্তি পাচ্ছে ৯৬ জন। অথচ সরেজমিনে সব শ্রেণি মিলিয়ে পাওয়া গেল মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থী। মাঠজুড়ে হাঁটুসমান ঘাস, শ্রেণিকক্ষগুলো প্রায় ফাঁকা। এর মধ্যেই ২১ শিক্ষক-কর্মচারী প্রতি মাসে বেতন হিসেবে তুলছেন ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৬৪ টাকা। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার নিজাই খামার বালিকা দাখিল মাদরাসায় প্রায় এক দশক ধরে এমন চিত্রের অভিযোগ উঠেছে।
১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদরাসার ইবতেদায়ি শাখায় প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নেই আলাদা শ্রেণিকক্ষ। শিক্ষক-কর্মচারীদের হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর থাকলেও সরেজমিনে ভারপ্রাপ্ত সুপার আব্দুল গফফারসহ কয়েকজনকে পাওয়া যায়নি।
শুধু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নয়, মাদরাসাটির পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৩ সালে দাখিল পরীক্ষায় এখান থেকে পাস করেছে পাঁচজন, ২০২৪ সালে চারজন এবং ২০২৫ সালে মাত্র তিনজন। অথচ প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ২১ শিক্ষক-কর্মচারীর পেছনে প্রতি মাসে সরকারি বেতন বাবদ যাচ্ছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৬৪ টাকা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিভিন্ন নূরানি ও হাফেজিয়া মাদরাসায় পড়া শিক্ষার্থীদের নাম হাজিরা খাতায় রাখা হলেও বাস্তবে নিজাই খামার মাদরাসায় নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। এমনকি দাখিল পরীক্ষার আগে অন্য মাদরাসা থেকে শিক্ষার্থী এনে তাদের নাম এ প্রতিষ্ঠান থেকে নিবন্ধন করিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ানোর অভিযোগও করেছেন তারা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, বাস্তবে শিক্ষার্থী না থাকলে কাদের নামে হাজিরা, উপবৃত্তি ও সরকারি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তারা শিক্ষার্থী তালিকা, উপবৃত্তির তথ্য, শ্রেণি হাজিরা, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং দাখিল পরীক্ষার নিবন্ধন যাচাই করে প্রকৃত চিত্র বের করার দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক দেখানো হলেও বাস্তবে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি খুবই কম। শিক্ষার্থী না থাকলে তাদের নামে হাজিরা, উপবৃত্তি বা সরকারি সুবিধা কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, আশপাশে নূরানি ও হাফেজিয়া মাদরাসা গড়ে ওঠায় অনেক শিক্ষার্থী সেখানে পড়ছে। তবে কাগজে দেখানো শিক্ষার্থী সংখ্যা ও বাস্তব উপস্থিতির মধ্যে এত বড় পার্থক্যের কারণ খতিয়ে দেখা উচিত। শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের হাজিরাও যাচাই করা দরকার।
তবে মাদরাসাটির সাবেক সুপার ও বর্তমান সভাপতি মহাম্মদ আলী শিক্ষার্থী কম থাকার জন্য বাল্যবিয়েকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, অনেক ছাত্রী বিয়ের পর অন্যত্র চলে যায়। পাশাপাশি আশপাশের নূরানি ও হাফেজিয়া মাদরাসার কারণেও শিক্ষার্থীরা সেখানে চলে যাচ্ছে।
কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, মাদরাসাটির অবস্থা খুবই করুণ। বর্তমানে ৩-৪ জন ছাত্রী নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চলছে এবং পরীক্ষার ফলাফলও খারাপ। বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে।
