গাজীপুর প্রতিনিধি:গাজীপুরের সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে ‘অঙ্গীভূত আনসার মৌলিক প্রশিক্ষণ-২০২৬’ এর সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নবীন আনসার সদস্যদের সালাম ও অভিবাদন গ্রহণ করেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের অর্থনীতি, শিল্পকারখানা ও গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইগুলোর (KPI) নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সদস্যদের পেশাগত মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণে বহুমুখী সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণসহ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কল্যাণমুখী উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।
মহাপরিচালক বলেন, দেশের পাঁচ হাজারেরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও কেপিআইয়ের নিরাপত্তায় প্রায় ৫৫ হাজারের বেশি অঙ্গীভূত আনসার সদস্য নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলা ও জরুরি পরিস্থিতিতে বাহিনীর সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা হবে।
তিনি দায়িত্ব পালনকালে সরকারি জানমাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেসব অঙ্গীভূত আনসার সদস্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোতে ডাকাতির চেষ্টা প্রতিহত করাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দুষ্কৃতকারীদের অপতৎপরতা প্রতিরোধে অঙ্গীভূত আনসার সদস্যরা সাহসিকতা, সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের এই অবদান বাহিনীর গৌরব ও মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে।
অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, তাদের বেতন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত রেস্ট প্রথা বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিজ বিভাগে বদলির সুযোগ সৃষ্টি এবং রেশন ব্যবস্থার মান ও পরিমাণ বৃদ্ধিসহ সদস্যদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাহিনীর সংস্কার ও সদস্যকল্যাণে গৃহীত উদ্যোগগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে তাদের ভূমিকা আরও সম্প্রসারিত হবে। সদস্যদের প্রাপ্য বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হচ্ছে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী যাতে সদস্যদের প্রাপ্য ভাতা আত্মসাৎ করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে মহাপরিচালক বলেন, বর্তমান সময়ের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের প্রশিক্ষণকে আরও যুগোপযোগী করা হয়েছে। মৌলিক প্রশিক্ষণে শারীরিক সক্ষমতা, সাধারণ ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ, অস্ত্র পরিচালনা, নিরাপত্তা পদ্ধতি, ইনসিডেন্ট ম্যানেজমেন্ট, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, আইন ও বিধিবিধানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারী সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, আজ থেকে তারা বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর গর্বিত আনসার। এই পরিচয় তাদের জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি দেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও অঙ্গীকার। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করে সততা, নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি নবীন অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
গত ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ৬০ দিনব্যাপী অঙ্গীভূত আনসার মৌলিক প্রশিক্ষণে অনুমোদিত ৬৯২ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে ৬৫৪ জন অংশগ্রহণ করেন এবং তাদের মধ্যে ৬২৭ জন সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। প্রশিক্ষণে ফায়ারে প্রথম স্থান অর্জন করেন কুমিল্লা জেলার কাজী মো. আবু সাঈদ, ড্রিলে প্রথম স্থান অর্জন করেন নোয়াখালী জেলার মো. ফিজুর রহমান এবং সেরা প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচিত হন খাগড়াছড়ি জেলার মো. সাবিকুর রহমান। মহাপরিচালক কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের পুরস্কার বিতরণ করেন এবং বিশেষ অভিনন্দন জানান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে কুচকাওয়াজ শেষে তুরস্ক জেন্ডামেরি দলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় একটি দাঙ্গা প্রতিরোধ নিরাপত্তা মহড়া প্রদর্শন করা হয়। মহড়া শেষে মহাপরিচালক বলেন, যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আনসার ব্যাটালিয়ন, আনসার গার্ড ব্যাটালিয়ন ও অঙ্গীভূত আনসার সদস্যরা নিজস্ব সক্ষমতায় দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাহিনীর এই সক্ষমতার প্রতিফলন সম্প্রতি গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন মোকাবিলায়ও পরিলক্ষিত হয়েছে।
মহাপরিচালক সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার জন্য একাডেমির কমান্ড্যান্ট, প্রশিক্ষকমণ্ডলী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানান। তিনি নবীন সদস্যদের কর্মজীবনের সর্বাঙ্গীণ সাফল্য, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবন কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুনূর রশীদ, আনসার ও ভিডিপি একাডেমির কমান্ড্যান্ট (অতিরিক্ত মহাপরিচালক) মো. সাইফুল্লাহ রাসেল, তুরস্ক থেকে আগত প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-প্রশিক্ষক এবং বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্যরা।
