হিমালয়ের নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫০ জনে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। প্রবল স্রোত, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান চলছে। তবে নতুন করে নদীর পানি বাড়ায় এবং ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় উদ্ধারকাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে শতাধিক শ্রমিক আটকে থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নেপালে ৭৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটিতে এখনো ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৬ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। সব মিলিয়ে দুই অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা ৭৫০ এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৪৪ নয়, বরং ৩ হাজার ৪৪ জন।
নেপালে নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন শত শত বিদেশি নাগরিক। এছাড়া বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৯৩৩ জন শ্রমিকেরও এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভয়াবহ বন্যার স্রোতে নদীর তীরবর্তী প্রকল্প, সড়ক, সেতু ও বসতিগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কয়েকটি টানেলে। শতাধিক শ্রমিক সেখানে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপালি সেনাবাহিনী ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে পাইপ ঢুকিয়ে ভেতরে বাতাস সরবরাহ শুরু করেছে। তবে রাতভর বৃষ্টি এবং নদীর পানি বাড়তে থাকায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।
আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহায়তাও আসতে শুরু করেছে। টানেল উদ্ধারে অভিজ্ঞ ভারতের ১১ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং চীনের ৯ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল নেপালে পৌঁছেছে। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ ও টানেলের ভেতরে জীবিতদের সন্ধানে কাজ করছেন।
এর মধ্যেই নতুন আরেক বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তিব্বত সীমান্তে। শনিবারের ভূমিধসের পর সেখানে নতুন একটি হ্রদ বা জলাধার তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি। নতুন তৈরি হওয়া এই জলাধারটি আগে খালি হয়ে যাওয়া একটি হ্রদ থেকে মাত্র ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার দূরে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে নতুন করে বন্যার সৃষ্টি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় গিরং সীমান্তবন্দর এলাকার উদ্ধারকর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগের পেছনে হিমবাহ ধসকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, চীন-নেপাল সীমান্তের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নিচের দিকে নেমে আসে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়াও জানিয়েছে, লিরুং পর্বতের দক্ষিণ ঢালের একটি হিমবাহ ভেঙে পড়ার পরই ভয়াবহ এই ধস ও বন্যার সৃষ্টি হয়।
এই দুর্যোগে নেপালের প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে ধারণা করছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস। ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনে নেপাল আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে। বিশেষ করে ভারী সরঞ্জাম বহনে সক্ষম ড্রোন, মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার কিট এবং মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজার ইউনিটের প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে দেশটি।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা প্রায় ৩৬ লাখ ডলার করে, যুক্তরাজ্য ৬৮ লাখ ডলার, জাতিসংঘ ২৫ লাখ ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৩ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। মালয়েশিয়া বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠানোর পাশাপাশি ১০ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে এখনো সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিখোঁজদের নিয়ে। ধ্বংসস্তূপ, কাদা, নদীর প্রবল স্রোত এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কার মধ্যেও উদ্ধারকারীরা জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভয়াবহ এই দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে সময় লাগতে পারে।
