বিদেশ সফরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নিরাপত্তায় যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার একটি দিক বেশ অস্বাভাবিক। সফর শেষে তাঁর ব্যবহৃত মল-মূত্রসহ শারীরিক বর্জ্যও বিশেষভাবে সংগ্রহ করে সিলগালা করা ব্রিফকেসে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যেন এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে পুতিনের শারীরিক অবস্থা বা স্বাস্থ্যের বিষয়ে কোনো তথ্য জানতে না পারে, মূলত সে কারণেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে পুতিনের বিদেশ সফরের এই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিনের বডিগার্ডরা তাঁর ব্যবহৃত বর্জ্য সংগ্রহ করে বিশেষভাবে সিলগালা করা ব্রিফকেসে রাখেন। এরপর সেটি নিরাপদে বিমানে করে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। উদ্দেশ্য হলো, পুতিনের শারীরিক অবস্থার কোনো তথ্য যাতে তাঁর ব্যবহৃত বর্জ্য থেকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে না যায়।
পুতিনের বিদেশ সফরে এমন ব্যবস্থা নতুন নয়। ২০১৭ সালে ফ্রান্স সফর, ২০১৯ সালে সৌদি আরব সফর এবং যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা সফরের সময়ও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাংবাদিক ফরিদা রুস্তমোভার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে রাশিয়ার নেতৃত্বে আসার পর থেকেই পুতিন বিদেশ সফরে এই ধরনের সতর্কতা অনুসরণ করে আসছেন। এমনকি সফরের সময় ব্যবহারের জন্য তাঁর সঙ্গে বিশেষ বহনযোগ্য টয়লেটও রাখা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
পুতিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্বে রয়েছে রাশিয়ার ফেডারেল প্রোটেক্টিভ সার্ভিস (এফএসও)। প্রকাশ্য নিরাপত্তারক্ষীদের পাশাপাশি এই ব্যবস্থার আড়ালে কাজ করেন প্রেসিডেন্সিয়াল সিকিউরিটি সার্ভিসের বিশেষ প্রশিক্ষিত সদস্যরা। তাঁদের দায়িত্ব শুধু পুতিনের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়, তাঁর খাবার, যাতায়াত ও সফরের বিভিন্ন খুঁটিনাটিও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
পুতিনের খাবার নিয়েও রয়েছে বিশেষ সতর্কতা। বিষপ্রয়োগের ঝুঁকি এড়াতে তাঁর খাবারে ব্যবহৃত উপাদান আগে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এরপর খাবার পরিবেশনের আগে নিরাপত্তা দলের সদস্যরা সেটি পরীক্ষা করেন। পুতিনের খাদ্যাভ্যাসেও রয়েছে কিছু বিধিনিষেধ। তিনি সাধারণত ফাস্টফুড ও রাতে অতিরিক্ত মাংস খাওয়া এড়িয়ে চলেন। সরকারি অনুষ্ঠানে তাঁকে আদা বা গোলাপের চা পান করতেও দেখা যায়।
বিদেশ সফরে পুতিনের যাতায়াতও সাধারণ রাষ্ট্রপ্রধানদের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপত্তাবেষ্টিত। তাঁর জন্য ব্যবহৃত হয় সুরক্ষিত ‘আউরাস সেনাট’ লিমুজিন, যেটিকে বিস্ফোরণ ও বিভিন্ন ধরনের হামলা প্রতিরোধের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য গাড়িটিতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা থাকার কথা বলা হয়।
পুতিনের আকাশযাত্রার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। তিনি ‘ডুমসডে প্লেন’ হিসেবে পরিচিত রুশ বিশেষায়িত বিমানের মাধ্যমে ভ্রমণ করতে পারেন। তাঁর ব্যবহৃত ইলিউশিন আইএল-৯৬-৩০০পিইউ উড়োজাহাজে সুরক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থা, মেডিকেল সুবিধা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, পুতিনের বিদেশ সফরের নিরাপত্তা শুধু দৃশ্যমান বডিগার্ড কিংবা সাঁজোয়া গাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর খাবার থেকে শুরু করে ব্যবহৃত টয়লেট এবং শারীরিক বর্জ্য পর্যন্ত নিরাপত্তার আওতায় রাখা হয়। বিশেষ করে মল-মূত্র রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি দেখিয়ে দেয়, পুতিনের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিদেশি গোয়েন্দাদের নাগালের বাইরে রাখতে মস্কো কতটা কঠোর নিরাপত্তা নীতি অনুসরণ করে।
সূত্র: এনডিটিভি
