সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আগ্রহ কতটা বেড়েছে, তার বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি প্রার্থী। অর্থাৎ প্রতিটি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন। বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর কারণে নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন করতে গিয়ে জটিলতায় পড়েছে কর্তৃপক্ষ।
গত মে মাসে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের ৫২টি ক্যাটাগরিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে এসব পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ২ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন নেওয়া হয়। পদভেদে আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫০ থেকে ১০০ টাকা।
তবে আবেদনের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নিয়ে নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজনের পূর্ব অভিজ্ঞতা তাদের নেই। পরীক্ষাকেন্দ্র নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র মুদ্রণ, পরিদর্শক নিয়োগ এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন—প্রতিটি ধাপেই বড় ধরনের লজিস্টিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
লিখিত, ব্যবহারিক ও মৌখিক—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তিন ধাপে পরীক্ষা কীভাবে আয়োজন করা হবে, তা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, স্বচ্ছতা বজায় রেখে দ্রুত নিয়োগ শেষ করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক পাঁচটি সাধারণ বিসিএসের আবেদনকারীর সংখ্যার সঙ্গেও এই নিয়োগের আবেদনকারীর সংখ্যা তুলনীয় নয়। সর্বশেষ ৫০তম বিসিএসে ২ হাজার ১৫০টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ২ লাখ ৯০ হাজার প্রার্থী। এর আগে ৪৯তম বিসিএসে ৩ লাখ ১২ হাজার, ৪৭তম বিসিএসে ৩ লাখ ৭৪ হাজার, ৪৬তম বিসিএসে ৩ লাখ ৩৭ হাজার এবং ৪৫তম বিসিএসে ৩ লাখ ৪৬ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল।
এবার সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগে আবেদনকারীর সংখ্যা ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ওই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল প্রায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজার শিক্ষার্থী।
নিয়োগের শূন্য পদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৭৮টি অফিস সহায়ক পদ। এসব পদের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে এসএসসি পাস। এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩১২ জন সমাজকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। তাদের দায়িত্বের মধ্যে থাকবে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচন ও যাচাই।
অর্থনীতিবিদরা বিপুলসংখ্যক আবেদনকে দেশের বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সংকটের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি স্থবির থাকায় প্রতিযোগিতামূলক বেতন, চাকরির নিশ্চয়তা ও সামাজিক মর্যাদার আশায় তরুণদের একটি বড় অংশ সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকছেন।
তিনি বলেন, করপোরেট খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়লে সরকারি চাকরির ওপর এ ধরনের বাড়তি চাপ তৈরি হতো না।
