খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার ইউনিটে প্রায় ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ভবনে নারী ও পুরুষের জন্য ১০টি টয়লেট তৈরি করা হলেও নির্মাণের পর থেকে এক দিনের জন্যও সেগুলো ব্যবহার করা যায়নি। ভবনটিতে ফাটল দেখা দেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে পুরো স্থাপনাটি। এরই মধ্যে নষ্ট হতে শুরু করেছে টয়লেটের বিভিন্ন সরঞ্জাম, আবার কিছু সামগ্রী চুরিও হয়ে গেছে। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত, আর টয়লেট সংকটে ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্যানসার চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা।
খুলনা বিভাগের একমাত্র সরকারি ক্যানসার ইউনিটের পেছনে নির্মিত একতলা ভবনটিতে আধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর বা রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপনের জন্য একটি সুরক্ষিত বাংকারের পাশাপাশি পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক পাঁচটি করে টয়লেট নির্মাণ করা হয়। রোগী ও স্বজনদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই এসব টয়লেট তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ভবনটি চালু হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় সেটি আর ব্যবহার করা হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির দেয়ালে লম্বালম্বি বড় বড় ফাটল রয়েছে। ছাদের বিভিন্ন অংশেও চিড় ধরেছে। কোথাও কোথাও খসে পড়েছে প্লাস্টার। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের চারপাশে জন্মেছে আগাছা। টয়লেটগুলোর দরজায় ঝুলছে তালা। ভেতরে কমোড, ওয়াশবেসিনসহ বিভিন্ন স্যানিটারি সরঞ্জাম থাকলেও দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় সেগুলোর অনেকটাই নষ্ট হওয়ার পথে।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার সুযোগে টয়লেটের কল, বেসিনের কলসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। ফলে লাখ লাখ টাকা খরচ করে নির্মিত স্থাপনাটি যেমন রোগীদের কোনো কাজে আসছে না, তেমনি এর অবকাঠামো ও সরঞ্জামও ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের দিকে। নির্মাণ শেষে ২০২১ সালের ৫ এপ্রিল গণপূর্ত বিভাগ লিখিতভাবে ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু এর পরপরই ভবনটির পাশেই নতুন বিভাগীয় ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ওই সময় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও নির্মাণকাজের কারণে পুরোনো ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেয়। পরে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভবনটি ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়।
হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় আল আমিন শেখ খোকন বলেন, ভবনটি নির্মাণ করা হলেও কখনো ব্যবহার করা হয়নি। নির্মাণের পর থেকেই এটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
সাকিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, নতুন ক্যানসার ইউনিটের ভবন নির্মাণের সময় পুরোনো ভবনে ফাটল দেখা দেয়। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় রোগী কিংবা হাসপাতালের অন্য কেউ এটি ব্যবহার করতে পারেননি।
মনিরুল ইসলাম বলেন, রোগীদের সুবিধার জন্যই টয়লেটগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু পাশের বড় ভবনের নির্মাণকাজের সময় ফাটল দেখা দেওয়ায় সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
ক্যানসার ইউনিটের প্রধান ডা. মো. মুকিতুল হুদা বলেন, টয়লেটগুলো নির্মাণের পর ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে প্রায় সব কটি টয়লেটের কল, বেসিনের কলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চোরেরা নিয়ে গেছে।
এদিকে ক্যানসার ইউনিটে পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের জন্য একটি ব্যবহারযোগ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের প্রয়োজন হলেও হাসপাতাল চত্বরে নির্মিত ২৭ লাখ টাকার টয়লেটগুলো তালাবদ্ধ পড়ে আছে।
চিকিৎসা নিতে আসা শেখ শামছুল হাসান বলেন, হাসপাতালে এসে টয়লেট খুঁজে পাওয়া বড় সমস্যার একটি। চোখের সামনে একটি ভবন তালাবদ্ধ পড়ে থাকলেও সেটি ব্যবহার করতে না পারায় রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
প্রকৌশল সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো নতুন স্থাপনা নির্মাণের সময় পাশের ভবনে ফাটল দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে কারিগরি তদন্ত করা প্রয়োজন। নির্মাণ ত্রুটি, মাটির বৈশিষ্ট্য কিংবা ভারী নির্মাণকাজ—যেকোনো কারণেই ভবনে ফাটল সৃষ্টি হতে পারে। তাই ভবনটির বর্তমান অবস্থা এবং ফাটলের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে প্রকৌশলগত মূল্যায়ন জরুরি।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো কাগজপত্র তিনি আগের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও পাননি। ঘটনাটি তার দায়িত্ব গ্রহণের আগের হওয়ায় তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে ভবনটির বর্তমান অবস্থা নির্ণয় করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ক্যানসারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও সহজলভ্য টয়লেট কোনো বিলাসিতা নয়; এটি চিকিৎসাসেবারই মৌলিক অংশ। অথচ রোগীদের প্রয়োজনের সময় ব্যবহারযোগ্য টয়লেট বন্ধ রেখে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনা নষ্ট হতে দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে ভবনটির বর্তমান অবস্থা নির্ধারণ করা হোক। ভবনটি নিরাপদ ও ব্যবহার উপযোগী হলে তা সংস্কার করে রোগীদের কাজে লাগানো উচিত। আর নির্মাণে অনিয়ম, ত্রুটি কিংবা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
