BMBF News
প্রিমিয়াম ওয়েব হোস্টিং + ফ্রি ডোমেইন
সাথে পাচ্ছেন ফ্রি SSL এবং আনলিমিটেড ব্যান্ডউইথ!
অফারটি নিন »

স্কুল ভেসে গেল, গাছে উঠে বাঁচল ৮ বছরের জোয়াল, ফিরল মায়ের কোলে

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক ঢলে যখন মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, রাস্তা ও স্থাপনা ভেসে যাচ্ছে, তখন জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পাহাড়ি জঙ্গলে গিয়ে একটি গাছে উঠে আশ্রয় নেয় আট বছরের শিশু জোয়াল ঘালে। স্কুল ভবন ও আশপাশের এলাকা পানির স্রোতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও গাছের ডালে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বেঁচে যায় সে। একদিন পর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর হাসপাতালে জীবিত ছেলেকে ফিরে পেয়ে স্বস্তি ফিরেছে মা মাট্টি মায়া তামাংয়ের জীবনে।

গত বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহধসের পর ভয়াবহ ঢল নামে ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীতে। বরফ, পানি, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে ভাসিয়ে নেয় বিস্তীর্ণ এলাকা। এতে নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৬২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২৪ জনে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি বলে জানা গেছে।

এই ভয়াবহ দুর্যোগের পরদিন বৃহস্পতিবার রাসুয়া জেলা থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় জোয়ালকে। তার ডান পা ভেঙে গেছে এবং মুখে রয়েছে আঘাত ও আঁচড়ের চিহ্ন। প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এদিকে দুই ছেলের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন জোয়ালের মা ২৮ বছর বয়সী মাট্টি মায়া। আকস্মিক ঢলের সময় তার দুই ছেলে স্কুলে ছিল। প্রবল স্রোতে স্কুল ভবনসহ আশপাশের এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তার দুই সন্তানই হয়তো আর বেঁচে নেই।

সন্তানদের খোঁজে এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আরেক আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে বেড়ান মাট্টি মায়া। ত্রাণ ও উদ্ধারকেন্দ্রগুলোতেও খোঁজ নেন। কিন্তু কোথাও সন্তানদের সন্ধান পাননি। রয়টার্সকে তিনি বলেন, চারটি জায়গায় গিয়েও কোথাও সন্তানদের নামের সন্ধান না পাওয়ায় তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তার দুই সন্তানই মারা গেছে। তখন কান্না করা ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না।

বৃহস্পতিবার দুই ছেলের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে একপর্যায়ে রয়টার্সের সাংবাদিক শাহানা বজ্রাচার্যের ফোন নম্বর পান মাট্টি মায়া। এর কয়েক ঘণ্টা আগে নুয়াকোটের একটি হাসপাতালে আহত জোয়ালের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শাহানার।

এক শিশুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে—এমন খবর পেয়ে শাহানা ও রয়টার্সের একটি দল সেখানে যায়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটির পরিবারের সদস্যরা কোথায় রয়েছেন, তা জানত না। এমনকি তারা বেঁচে আছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত ছিল না।

এদিকে জোয়ালকে কাঠমান্ডুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। এর মধ্যেই শাহানা শিশুটির সঙ্গে কথা বলেন। পরিবারের সদস্যরা যাতে তাকে শনাক্ত করতে পারেন, সে জন্য জোয়ালকে নিয়ে একটি ভিডিও করার কথা বলেন তিনি। শিশুটিও এতে রাজি হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের ফোন নম্বর রেখে যান ওই সাংবাদিক। তার ধারণা ছিল, শিশুটির পরিবারের কেউ হয়তো একসময় তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়।

ছেলের খোঁজে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শাহানাকে ফোন করেন মাট্টি মায়া। সাংবাদিক যখন তাকে জানান, জোয়াল জীবিত আছে এবং চিকিৎসার জন্য তাকে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে, তখনও কথাটি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি।

মাট্টি মায়া বলেন, তাকে যখন জানানো হয় জোয়াল কোথায় আছে, তখন কথাটি সত্যি বলে মনে হচ্ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো আর কখনোই ছেলেকে খুঁজে পাবেন না।

এরই মধ্যে ছোট ছেলেকেও জীবিত খুঁজে পান মাট্টি মায়া। দুই সন্তানকে ফিরে পাওয়ার পর তিনি বলেন, অবশেষে বড় ছেলের সন্ধান পেয়ে তার মনে হয়েছে, যেন তার জীবনটাই আবার ফিরে পেয়েছেন।

বুধবার সকালে অন্য দিনের মতো দুই ভাই গাড়িতে করে স্কুলে যায়। আর বাড়িতে তাঁত বুনছিলেন তাদের মা। হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো বিকট শব্দ শুনতে পান তিনি। বাইরে তাকিয়ে দেখেন, ভয়াবহ স্রোতে সবকিছু ভেসে যাচ্ছে।

মাট্টি মায়া বলেন, তিনি শুধু দেখতে পাচ্ছিলেন সবকিছু পানির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে। বারবার তার মনে হচ্ছিল, তার ছেলেরাও নিশ্চয়ই সেই স্রোতে ভেসে গেছে।

সন্তানদের খোঁজে স্কুলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। স্বাভাবিক সময়ে বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু বন্যার পর পুরো এলাকার চেহারা বদলে যায়। কোথায় স্কুল ছিল, কোথায় বাজার ছিল—কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। চারদিকে শুধু পানি, পাথর ও কাদা।

পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে নুয়াকোটের ১৫ শয্যার চক্রদেব হাসপাতালে জোয়ালের সন্ধান পান সাংবাদিক শাহানা। তখন শিশুটির ডান পা ভাঙা এবং মুখে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার বাঁ হাতে শক্ত করে ধরা ছিল ১০ রুপির দুটি নোট।

হাসপাতাল কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্যরা ওই টাকা শিশুটিকে দিয়েছিলেন। হাসপাতালে যেতে রাজি করানোর জন্য তাকে টাকা দেওয়া হয়েছিল।

শাহানা ধীরে ধীরে জোয়ালের সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে শিশুটি জানায়, ঢল নামার সময় সে স্কুলে পড়াশোনা করছিল। হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। তখন এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে দৌড়ে পাহাড়ি জঙ্গলের দিকে চলে যায় সে। পানির ভয়াবহ স্রোত থেকে বাঁচতে একটি গাছে উঠে বসে।

শাহানা যখন তাকে জিজ্ঞাসা করেন, সে ভয় পেয়েছিল কি না, তখন জোয়াল মাথা নেড়ে জানায়, ‘না’।

দুর্যোগের পর ওই এলাকায় বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে জোয়ালের পরিবারের সদস্যদের কাঠমান্ডুতে পৌঁছে দিতে সাংবাদিক শাহানা একটি গাড়ির ব্যবস্থা করেন। প্রায় দুই ঘণ্টার যাত্রা শেষে তারা হাসপাতালে পৌঁছান।

হাসপাতালে ছেলের শয্যার পাশে গিয়ে নীরবে দাঁড়ান মাট্টি মায়া। দীর্ঘ সময়ের উৎকণ্ঠা, কান্না আর অনিশ্চয়তার পর জীবিত সন্তানকে চোখের সামনে পেয়ে স্বস্তি ফিরে আসে তার চোখেমুখে।

জোয়ালের বাবা জাপানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ছেলের দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর তিনিও তার কাছে আসার জন্য রওনা হয়েছেন।

এদিকে রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় ভয়াবহ ঢলে অন্তত ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশুদের শনাক্ত ও নিবন্ধনের কাজ করছে সংস্থাটি। নেপাল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব শিশুকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ভয়াবহ এই দুর্যোগে রাসুয়া জেলার অসংখ্য মানুষের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। অনেক পরিবার হারিয়েছে ঘরবাড়ি, স্বজন ও জীবিকার উৎস। সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝেও দুই সন্তানকে ফিরে পেয়ে নতুন করে বাঁচার স্বস্তি পেয়েছেন মাট্টি মায়া।

হাসপাতালে ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, জোয়াল সবসময়ই ভীষণ দুষ্টু। হাড় ভাঙার ঘটনাও তার জীবনে এবারই প্রথম নয়। তবে এবারের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য থেকে ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়া যে তার জন্য কত বড় স্বস্তি, তা মায়ের চোখেমুখেই স্পষ্ট।

সুত্র: রয়টার্স

Pearl IT
ওয়েব ডিজাইন
গ্রাফিক্স ডিজাইন
কন্টেন্ট পাবলিশিং
এসইও সার্ভিস
অর্ডার করুন »