কিউবাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা গেছে, সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতির জন্য আগামী ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে প্রয়োজন হতে পারে—এমন বিভিন্ন সহায়ক ইউনিটের সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে। যদিও নথিতে কিউবার নাম সরাসরি উল্লেখ নেই, একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি কিউবাকেন্দ্রিক চলমান সামরিক পরিকল্পনার অংশ। তবে এখন পর্যন্ত কিউবায় সেনা পাঠানোর কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কিউবার ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন হবে বলে তিনি মনে করেন না এবং দেশটির সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করছেন।
মার্কিন সেনাবাহিনীর রিজার্ভ বাহিনী আগামী চার মাসের মধ্যে সাউদার্ন কমান্ডকে বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও সহায়ক ইউনিট সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা যাচাই করছে। বিষয়টি নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ একটি অভ্যন্তরীণ নথি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
নথিতে কিউবার নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিউবাকে ঘিরে চলমান সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা এসব তথ্য দিয়েছেন, কারণ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি তাদের নেই।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নথিতে কোনো নির্দিষ্ট ইউনিটকে কিউবা বা অন্য কোনো স্থানে মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। কতসংখ্যক সেনা প্রয়োজন হতে পারে, তাদের কোথায় পাঠানো হবে কিংবা কী ধরনের অভিযানে তারা অংশ নেবে—এসব বিষয়ও নথিতে উল্লেখ নেই।
সিবিএস নিউজের পর্যালোচনা করা নথিতে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর রিজার্ভ সদর দপ্তর অধীনস্থ কমান্ডগুলোর কাছে ছয় ধরনের ইউনিটের সম্ভাব্য প্রাপ্যতা সম্পর্কে তথ্য চেয়েছে। এসব ইউনিট আগামী ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে প্রয়োজন হতে পারে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব তথ্য সেনা রিজার্ভ সদর দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
চাওয়া ইউনিটগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি কমব্যাট সাসটেইনমেন্ট সাপোর্ট ব্যাটালিয়ন। এই ইউনিট সামরিক পরিবহন, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ও সরবরাহসহ বিভিন্ন ধরনের রসদ ব্যবস্থাপনায় কাজ করে। পাশাপাশি একটি ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি এক্সপেডিশনারি সাসটেইনমেন্ট কমান্ডের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা কোনো সামরিক অভিযান এলাকায় সামগ্রিক রসদ ব্যবস্থাপনা তদারক করতে পারে। চিকিৎসা সহায়তার জন্য একটি মেডিকেল ব্রিগেড এবং জরুরি অস্ত্রোপচার ও গুরুতর আহতদের চিকিৎসার জন্য একটি ফরোয়ার্ড রিসাসিটেটিভ অ্যান্ড সার্জিক্যাল ডিটাচমেন্টের কথাও রয়েছে।
নথিতে একটি সামরিক পুলিশ ব্রিগেডের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণত সামরিক পুলিশ ইউনিট নিরাপত্তা, আটক ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করে।

এ বিষয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর রিজার্ভ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, নিরাপত্তার কারণে চলমান বা ভবিষ্যৎ অভিযান, সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের সময়সূচি কিংবা সামরিক তৎপরতার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয় না। তবে দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়নে বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হয়।
এদিকে কিউবাকে ঘিরে সামরিক প্রস্তুতির খবরের মধ্যেই শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, কিউবার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন হবে বলে তিনি মনে করেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে। কিউবার বর্তমান পরিস্থিতিকে কঠিন উল্লেখ করে দেশটিকে সহায়তা করার আগ্রহের কথাও জানান তিনি।
তবে গত কয়েক মাসে কিউবা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য ও পদক্ষেপে চাপ বৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখেও কিউবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
এর আগে কিউবাকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়নের খবর প্রকাশিত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে কিউবার আশপাশের সমুদ্রপথ ও সামুদ্রিক প্রবেশপথে মার্কিন বাহিনীর গোয়েন্দা তৎপরতার কথাও কয়েকজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন। একই সময়ে মার্কিন বিমানবাহিনীর কিছু ইউনিটকে উচ্চ সতর্কতায় রাখার এবং সম্ভাব্য মোতায়েনের জন্য জনবল প্রস্তুত রাখার কথাও জানা যায়। তবে ওই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
জুলাই মাসে সিবিএস নিউজ জানায়, কিউবার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা কাজ করেছিলেন। এর মধ্যে হাজারো মার্কিন সেনাকে নিয়ে বিমান হামলা ও অবতরণ অভিযান চালানোর একটি পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে। তবে সে সময় মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছিলেন, এসব পরিকল্পনা বা সামরিক ব্রিফিংয়ের অর্থ এই নয় যে প্রেসিডেন্ট বা পেন্টাগন অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে কিউবার সঙ্গে রাশিয়া, চীন ও ইরানের সম্পর্ক নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগ রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের বার্ষিক হুমকি মূল্যায়নে কিউবাকে সরাসরি স্বাধীন কৌশলগত হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং দেশটিকে বড় ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যেও ট্রাম্প কিউবায় ‘মৌলিক পরিবর্তন’ আনার কথা বলেন। তিনি কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের পতন এবং দেশটিতে স্বাধীনতা আসার কথা উল্লেখ করেন। এ বক্তব্যের সময় কিউবার প্রতিনিধিদল অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যায়। ট্রাম্প আরও জানান, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হাভানার সঙ্গে আলোচনায় গভীরভাবে যুক্ত আছেন।
অন্যদিকে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল যেকোনো মার্কিন হামলা প্রতিহত করার অঙ্গীকার করেছেন। কিউবার পক্ষ থেকে মার্কিন পদক্ষেপকে ‘আগ্রাসন’ ও ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ফলে একদিকে কিউবাকে ঘিরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য প্রস্তুতি ও বিভিন্ন ইউনিটের সক্ষমতা যাচাইয়ের তথ্য সামনে এসেছে, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন হবে বলে তিনি মনে করেন না। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
