যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবার মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তেহরানের উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ইউরোপে থাকা মার্কিন অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। তেহরানের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা আরও বাড়ালে ইউরোপে থাকা মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পৃথক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইউরো নিউজ ও ইরান ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়া ও সাইপ্রাসের নাম রয়েছে।
ইরানের নেতাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বুলগেরিয়াকে সম্ভাব্য প্রথম লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। কারণ, গত মাসে দেশটি তাদের বাজমার বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক বিমানকে জ্বালানি নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। এর পাশাপাশি সাইপ্রাসও ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে। গত মার্চে দেশটিতে থাকা একটি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছিল।
শুধু স্থলভাগে থাকা সামরিক স্থাপনা নয়, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া সাব-সি ফাইবার অপটিক ক্যাবলও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্যাবল আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ইন্টারনেট অবকাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা ৪০ দিনের যুদ্ধের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। ৬০ দিনের ওই যুদ্ধবিরতি ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ হিসেবে পরিচিতি পায়। চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির সময় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে ফলপ্রসূ কোনো সমঝোতা ছাড়াই সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়েছে।
এর মধ্যেই গত সপ্তাহে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে কট্টরপন্থিদের নিয়ে আসেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আলোচনা চলছে না।
ইরানের সামরিক বাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী ইউনিট ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডও সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি পূর্ণমাত্রার হামলা চালায়, তাহলে ইরানের পাল্টা জবাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
এর আগের সংঘাতের সময়ও ইরান দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতার ইঙ্গিত দিয়েছিল। যুদ্ধের শুরুতে ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ার দিকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি করেছিল তেহরান। এছাড়া যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গত মাসে জর্ডানে ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় দূরবর্তী স্থানে হামলা চালানোর সক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে ইরান বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছে রাশিয়া। গোয়েন্দা নথি ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি জানিয়েছে, ইরানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সরঞ্জাম এবং বিস্ফোরক সামগ্রীর একটি বড় চালান পাঠিয়েছে রাশিয়া।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের এই চালান নিয়ে দুই ডজনেরও বেশি রুশ জাহাজ কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ইরানের আমিরাবাদ বন্দরে পৌঁছেছে। ইরানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে ব্যবহৃত জাহাজগুলো রুশ জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমজি-ফ্লোটের তৈরি বলে জানা গেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানটির ওপর ২০২৪ সাল থেকে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
তেহরান ও মস্কোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশ ‘বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ নামে ২০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর আওতায় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার কথা রয়েছে।
এর আগে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও ইরান রাশিয়াকে নিজেদের তৈরি শাহেদ ড্রোন ও বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো দাবি করে আসছে। রাশিয়াও নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব ড্রোনের সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফলে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে উত্তেজনা এবং রাশিয়ার সামরিক সহায়তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তেহরানের ইউরোপে থাকা মার্কিন স্থাপনায় হামলার হুমকি বাস্তবে রূপ নিলে চলমান সংকট মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন মাত্রা পেতে পারে।
