রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৩৫টি আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এসব আলামতের মধ্যে রয়েছে ফল কাটার চাকু, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, নান রুটি, শসা, খেজুর, বেসিনের দাগসহ নিহত শিশু প্রিয়মের খাতায় পাওয়া একটি লেখা। তবে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হলেও এখনো কারাগারে থাকা দুই আসামির নমুনা নেওয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী।
সিআইডি ও তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে গিয়ে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করে। পরে সেগুলো তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামতের সংখ্যা ৩৫টিরও বেশি বলে জানিয়েছে সিআইডি। ঘটনার ১২ দিন পর গত দুই দিনে তিন দফায় আদালতের নির্দেশনা ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এসব আলামত ঢাকার সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো আলামতের মধ্যে রয়েছে ফল কাটার একটি চাকু, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, নান রুটি, শসা ও খেজুর। এছাড়া বেসিনে থাকা বিভিন্ন দাগ এবং নিহত শিশু প্রিয়মের খাতায় পাওয়া একটি লেখাও পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। এসব আলামত থেকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বৈজ্ঞানিক বা শারীরিক প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যাবে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, গত দুই দিনে তিন দফায় সিআইডি থেকে পাওয়া সব আলামত আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ঢাকার সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে কারাগারে থাকা আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, নিহত গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যের ডিএনএ নমুনা ইতোমধ্যে সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। আসামিদের নমুনা সংগ্রহের পর ফরেনসিক পরীক্ষায় পাওয়া নমুনার সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে দেখা হবে। ডিএনএ পরীক্ষায় মিল পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডে আসামিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ডিএনএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই আসামিদের ডিএনএ নমুনা দ্রুত সংগ্রহ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাতে ১২ দিন সময় লাগায় তদন্তের গতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
সিআইডির রংপুর কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানান, ঘটনার দিন সিআইডির বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা পরিদর্শক মিল্লাতের নেতৃত্বে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা ৩৫টিরও বেশি আলামত সংগ্রহ করেন। পরে সব আলামত তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ঘটনায় ইতোমধ্যে একই এলাকার দুই প্রতিবেশী মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্ত বর্তমানে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) করছে। মামলার দুই আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এখন ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল ও ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখার ওপরই তদন্তের পরবর্তী ধাপ অনেকটা নির্ভর করছে। আলামত ও ডিএনএ পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আসামিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্তকারীদের হাতে আরও শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তুলে দিতে পারে।
