যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। এর অংশ হিসেবে এবার সাধারণ নারীদেরও অস্ত্র চালনা ও শহরের ভেতরে সরাসরি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। তেহরানে খোলা মাঠে আয়োজিত এসব প্রশিক্ষণে নারীদের রাইফেল থেকে শুরু করে ভারী অস্ত্র চালনার পাশাপাশি জরুরি উদ্ধার, অগ্নিনির্বাপণ ও মানচিত্র দেখে দিক নির্ণয়ের কৌশল শেখানো হচ্ছে।
সম্প্রতি ইরানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সাধারণ পোশাক ও সামরিক পোশাক পরা নারীরা সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাদের কালাশনিকভ রাইফেল, ড্রাগুনভ স্নাইপার রাইফেল, আরপিজি এবং কাঁধে রেখে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র বা আকাশ প্রতিরক্ষা লঞ্চারসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের কৌশল শেখানো হচ্ছে।
শুধু অস্ত্র চালনাই নয়, প্রশিক্ষণে সামরিক কৌশল, মানচিত্র দেখে দিক নির্ণয়, জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম এবং অগ্নিনির্বাপণ পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিকদের দ্রুত প্রতিরোধ ও উদ্ধার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক বোমাবর্ষণের পর ইরানে ‘জান-ফাদা’ নামে একটি সাধারণ নাগরিক সামরিক প্রতিরোধ আন্দোলনও শুরু হয়েছে। বাসিজ মিলিশিয়া বাহিনীর অধীনে পরিচালিত এই কর্মসূচিতে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। নিবন্ধন শুরুর মাত্র ১০০ মিনিটের মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ এতে নাম নিবন্ধন করেন। এর ফলে প্রথম এক হাজার ইউনিট দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়।
বিপুল সংখ্যক মানুষের আগ্রহের পর সরকার আরও এক হাজার ইউনিট বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে। তেহরানের ইমাম হোসেন স্কয়ারে প্রথম প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালুর পর দেশটির বিভিন্ন এলাকাতেও এমন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে এলাকাভিত্তিক উদ্ধার ইউনিটও তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে স্বেচ্ছাসেবকদের বড় একটি অংশ নারী।
ইরানি কর্মকর্তারা এই উদ্যোগকে ১৯৮০ সালে ইরাকের আক্রমণের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির দেওয়া ‘২০ মিলিয়নের বাহিনী’ গড়ার আহ্বানের আধুনিক রূপ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শুধু নিয়মিত বাহিনী নয়, সাধারণ জনগণকেও প্রতিরোধ ও জরুরি কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

এদিকে দেশের ভেতরে গণপ্রস্তুতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আলী আবদোল্লাহি বলেছেন, ইরানের ওপর আবার যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে এর আগুনে সবাই পুড়বে এবং মার্কিন স্বার্থে সীমাহীন হামলা চালানো হবে।
সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমীর হাতামিও বলেছেন, সংঘাত এখনো শেষ হয়নি। নতুন করে হামলা হলে ইরানের জবাব হবে মর্মান্তিক ও চূর্ণবিচূর্ণকারী।
তবে একদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি চললেও অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের দরজাও খোলা রাখছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বিদেশি কূটনীতিকদের জানিয়েছেন, এই সংঘাতের কোনো সামরিক সমাধান নেই। শর্ত পূরণ এবং শত্রুতামূলক আচরণ বন্ধ হলে ইরান সাত দিনের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানান।
তবে ওয়াশিংটনের একতরফা কোনো দাবি মেনে নেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করেছে তেহরান। মূল দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে বলেও মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এর মধ্যেই যুদ্ধের প্রস্তুতি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং তেল রপ্তানি সীমিত হওয়ার কারণে ইরানের অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দেশটির তেলমন্ত্রী মহসেন পাকনেজাদের আকস্মিক পদত্যাগ ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
