জুবাইয়া বিন্তে কবির:
ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। প্রতিদিন লাখো মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই নগরীতে আসেন জীবিকার প্রয়োজনে। কিন্তু যে শহর মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করার কথা, সেই শহরের রাস্তাই এখন মানুষের সময়, শ্রম ও স্বস্তির সবচেয়ে বড় অপচয়স্থল। বাসে উঠতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামা, যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা, বেপরোয়া ওভারটেকিং, হঠাৎ ব্রেক, অস্বাভাবিক লেন পরিবর্তন এসব যেন ঢাকার গণপরিবহনের নিত্যদিনের চিত্র। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার বদলেছে, প্রযুক্তি এসেছে, মেট্রোরেল হয়েছে, অসংখ্য পরিকল্পনা হয়েছে তবু কেন বাসযাত্রার অভিজ্ঞতা বদলাচ্ছে না? দেশনায়ক তারেক রহমানের
নতুন সরকারের সামনে তাই একটি বড় সুযোগ ঢাকার গণপরিবহনকে কেবল কিছু নতুন বাস দিয়ে নয়, পুরো ব্যবস্থাটিকে নতুন করে সাজানো।
চার কোটি ট্রিপের নগরীতে বাসের সংকট
ঢাকার পরিবহন সংকটের ভয়াবহতা বোঝার জন্য কয়েকটি সংখ্যাই যথেষ্ট। সাম্প্রতিক DTCA-সংশ্লিষ্ট তথ্যে রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় চার কোটি ট্রিপের কথা বলা হয়েছে। অথচ বাসে যাতায়াতের অংশ নেমে এসেছে মাত্র ৭ শতাংশে; ২০০৯ সালে এই অংশ ছিল প্রায় ২৮ শতাংশ। একই সময়ে হাঁটা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
অর্থাৎ ঢাকার গণপরিবহন তার স্বাভাবিক ভূমিকা হারাচ্ছে। মানুষ বাসের বিকল্প হিসেবে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশা কিংবা হাঁটাকে বেছে নিচ্ছে। এতে রাস্তার ওপর চাপ আরও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও ঢাকার যানজটকে অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতার জন্য বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা যানজটে নষ্ট হয় এবং অর্থনীতিতে এর ক্ষতি বছরে বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
পুরোনো বাস, পুরোনো ব্যবস্থাপনা : ঢাকার গণপরিবহনের সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা পুরোনো ও অনিরাপদ বাস। BRTA-ভিত্তিক সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে নিবন্ধিত বাস ও মিনিবাসের প্রায় ৩০ শতাংশের বয়স ২০ বছরের বেশি। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঢাকায় ২০ বছরের বেশি বয়সী বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যার মূল কেবল বাসের বয়স নয়; সমস্যা ব্যবস্থাপনায়। মালিকানা খণ্ডিত, রুটে একাধিক কোম্পানির প্রতিযোগিতা, চালকের আয় অনেক ক্ষেত্রে ট্রিপ বা যাত্রীসংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তদারকি দুর্বল। ফলে নিরাপদে নির্ধারিত সময়ে যাত্রী পরিবহনের পরিবর্তে বেশি যাত্রী তোলাই হয়ে ওঠে চালকের অর্থনৈতিক প্রণোদনা। তাই চালককে কেবল শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নির্দিষ্ট বেতন, কর্মঘণ্টার সীমা, সাপ্তাহিক বিশ্রাম, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা। চালককে পেশাজীবীর মর্যাদা দিতে হবে, আবার সেই মর্যাদার সঙ্গে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
রুট রেশনালাইজেশন এবার বাস্তবায়ন চাই :
ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বছরের পর বছর কমিটি, সমীক্ষা ও পরিকল্পনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব সামান্য। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে DTCA-সংশ্লিষ্ট এক বৈঠকে জানা যায়, ঢাকায় অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে জরিপে সক্রিয় পাওয়া গেছে মাত্র ৯৮টি। নগরীর প্রয়োজন বিবেচনায় প্রায় ৬০টি রুট যথেষ্ট হতে পারে এবং ৩২টি রুট দ্রুত চালুর বিষয়ে ঐকমত্যের কথাও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন এক হাজারের বেশি বাস সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আরেকটি কমিটি নয়, এবার বাস্তবায়ন। এক রুটে এক কোম্পানি, নির্দিষ্টসংখ্যক বাস, নির্দিষ্ট স্টপেজ, নির্দিষ্ট সময়সূচি এবং নির্ধারিত সেবামান এই কাঠামোই হতে পারে ঢাকার বাসব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
ব্যবসা থাকবে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা নয় : গণপরিবহন অবশ্যই ব্যবসা। কিন্তু সেটি এমন ব্যবসা হতে পারে না যেখানে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতাই নিরাপত্তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
সিঙ্গাপুরের বাস কন্ট্রাক্টিং মডেল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সেখানে সরকার বা পরিবহন কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয়ভাবে রুট, সেবার মান ও পরিচালনার কাঠামো নির্ধারণ করে; অপারেটররা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট প্যাকেজ পরিচালনার দায়িত্ব পায়।
ঢাকাতেও এমন চুক্তিভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। মালিক বা কোম্পানি যাত্রী কাড়াকাড়ির ভিত্তিতে নয়, নির্ধারিত সেবা দেওয়ার বিনিময়ে আয় করবে। বাসের অবস্থান GPS-এ দেখা যাবে, সময়সূচি লঙ্ঘন হলে তা রেকর্ড হবে এবং বারবার নিয়ম ভাঙলে কোম্পানির চুক্তি বাতিলের সুযোগ থাকবে।
অর্থাৎ সরকার বাস চালাবে না; সরকার এমন একটি নিয়ম করবে, যার মধ্যে বেসরকারি খাত দক্ষতার সঙ্গে বাস চালাবে।
প্রযুক্তিই হতে পারে নতুন নিয়ন্ত্রক : ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর বিলাসিতা নয়, অপরিহার্যতা। ২০২৬ সালে DMP-এর AI-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট ব্যবস্থার উদ্যোগ সেই সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। পুলিশের একটি সরকারি টেন্ডারেও AI-সক্ষম স্মার্ট ANPR ক্যামেরা ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং ড্যাশবোর্ডের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন এই প্রযুক্তিকে বাসব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রতিটি বাসে GPS ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, গুরুত্বপূর্ণ বাসস্টপ ও মোড়ে AI ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, ইলেকট্রনিক টিকিটিং, ডিজিটাল ভাড়া এবং যাত্রী গণনার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কোন বাস নির্ধারিত রুটের বাইরে গেল, কোথায় অবৈধভাবে দাঁড়াল, কোন চালক বিপজ্জনকভাবে লেন পরিবর্তন করলেন এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হতে পারে।
তবে প্রযুক্তি যেন কেবল নজরদারির যন্ত্র না হয়। DTCA, BRTA, ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহন অপারেটরদের সমন্বয়ে একটি ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কমান্ড সেন্টার গড়ে তোলা জরুরি।
পাঁচটি সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে ঢাকা : দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে তাই অন্তত পাঁচটি অগ্রাধিকার থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, বাস রুট রেশনালাইজেশনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা ও বাস্তবায়ন। দ্বিতীয়ত, ২০ বছরের বেশি পুরোনো ও অনিরাপদ বাস ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে নতুন বাস কেনার জন্য মালিকদের সহজ ঋণ, কর-সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া। তৃতীয়ত, BRTA-এর ফিটনেস, রুট পারমিট ও লাইসেন্স ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং স্বচ্ছ করা। চতুর্থত, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ বন্ধে শক্তিশালী স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠা। পঞ্চমত, DTCA-কে প্রকৃত অর্থে ঢাকার সমন্বিত গণপরিবহনের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কার্যকর করা।
যাত্রী, চালক ও নাগরিক তিন পক্ষের অধিকার
গণপরিবহন সংস্কার কেবল বাস মালিকের বিষয় নয়। চালক-হেলপার ও যাত্রী দুই পক্ষকেই সংস্কারের অংশীদার করতে হবে। প্রতিটি বাসে দৃশ্যমান ভাড়া তালিকা, রুট ম্যাপ, বাস নম্বর ও অভিযোগের ব্যবস্থা থাকা উচিত। নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ, দক্ষতা পরীক্ষা, কর্মঘণ্টার সীমা ও ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ক্লান্ত ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশে একজন চালকের কাছ থেকে নিরাপদ সেবা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
নাগরিকদেরও দায়িত্ব আছে। ফুটপাত পথচারীর জন্য ছেড়ে দিতে হবে, জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করতে হবে, চলন্ত বাসে ওঠানামা বন্ধ করতে হবে এবং ট্রাফিক আইন মানতে হবে। রাষ্ট্র শৃঙ্খলা তৈরি করবে, নাগরিক সেই শৃঙ্খলা রক্ষা করবে—এই পারস্পরিক দায়িত্বেই গড়ে উঠবে সভ্য ঢাকা।
বাস, মেট্রো, রেল এক নেটওয়ার্কে ঢাকা :
ভবিষ্যতের ঢাকা শুধু বাসনির্ভরও হবে না। বাস, মেট্রোরেল, কমিউটার রেল, নৌপথ, হাঁটা ও সাইকেল সবকিছুকে একটি সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্কে আনতে হবে। একটি স্মার্ট কার্ড বা ডিজিটাল টিকিটে বাস ও রেল ব্যবহার করা গেলে যাত্রীর সময় ও ভোগান্তি কমবে। মেট্রো স্টেশনের সঙ্গে বাসস্ট্যান্ড যুক্ত হবে, শহরের প্রান্তে পার্ক-অ্যান্ড-রাইড সুবিধা থাকবে এবং প্রয়োজনীয় সড়কে বাস অগ্রাধিকার লেন চালু করা যাবে। উন্নত নগর মানে শুধু উঁচু ভবন নয়। উন্নত নগর হলো সেই শহর, যেখানে একজন শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধ কিংবা প্রতিবন্ধী মানুষ নিরাপদে, দ্রুত ও সম্মানের সঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
এবার সিদ্ধান্তের সময় : ঢাকার গণপরিবহনের গল্প দীর্ঘদিনের হতাশার গল্প। পরিকল্পনা হয়েছে, কমিটি হয়েছে, অভিযান হয়েছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোগান্তির বোঝা বহন করেছেন সাধারণ মানুষ।
এবার সেই বৃত্ত ভাঙার সময়। দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার চাইলে গণপরিবহন সংস্কারকে শুধু ঢাকার একটি প্রকল্প হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত করতে পারে। প্রয়োজন একটি ‘ঢাকা গণপরিবহন রূপান্তর মিশন’ যেখানে সরকার নীতি নির্ধারণ করবে, DTCA পরিকল্পনা ও সমন্বয় করবে, BRTA নিয়ন্ত্রণ করবে, ট্রাফিক পুলিশ আইন প্রয়োগ করবে, প্রযুক্তি তথ্য সরবরাহ করবে, মালিকরা বিনিয়োগ করবেন, চালক-হেলপার পেশাদার সেবা দেবেন এবং নাগরিকরা আইন মেনে চলবেন। সফল হলে এর সুফল শুধু যানজট কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; মানুষের সময় বাঁচবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে, দুর্ঘটনা ও দূষণ কমবে এবং ঢাকার জীবনযাত্রার মান বদলাবে। একদিন হয়তো ঢাকার বাসে ছয় ফুট উচ্চতার একজন যাত্রীকে আর হাঁটু ৪৫ ডিগ্রি কোণে ভাঁজ করে ‘আপসের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে না। জানালার বাইরে ছুটবে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, শৃঙ্খলিত ও মানবিক ঢাকা। সেই দিনটি কেবল ঢাকার গণপরিবহনের জয় হবে না হবে মানুষের সময়ের মুক্তি, নাগরিক মর্যাদার পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতারও জয়।
