শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুরে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে চরকুমারিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মিলন ঢালীর (৩৩) বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর সেটি তুলে নিতে ভুক্তভোগীর পরিবারকে হত্যা এবং ঘরবাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।
অভিযুক্ত মিলন ঢালী চরকুমারিয়া ইউনিয়নের ঢালীকান্দি এলাকার আক্কাস ঢালীর ছেলে। এ ঘটনায় মিলন ঢালী ও আনোয়ার ঢালী (৩৬) নামে দুজনকে আসামি করে গত ৯ আগস্ট সখিপুর থানায় ধর্ষণচেষ্টার মামলা করেন ভুক্তভোগীর মা নাজমা বেগম।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট দুপুরে ঢালীকান্দি এলাকায় বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন ২৩ বছর বয়সী সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা আইরিন লাবনী। ওই সময় বাড়িতে তিনি ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। এ সুযোগে পাশের বাড়ির বাসিন্দা মিলন ঢালী তার ঘরে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে আইরিনকে জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের চেষ্টা করেন তিনি। আইরিন চিৎকার করলে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে আশপাশের লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে হুমকি দিয়ে চলে যান মিলন। আহত অবস্থায় আইরিনকে ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, এর আগেও মিলন ওই নারীকে বিভিন্ন সময় কুপ্রস্তাব দিতেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে তাকে সতর্কও করা হয়েছিল।
মামলার পর থেকে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠছে। পরিবারের অভিযোগ, গত ১১ আগস্ট দুপুরে মিলন ঢালী ফোন করে মামলাটি তুলে না নিলে তাদের হত্যা এবং ঘরবাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এ ঘটনার পর গত কয়েকদিন ধরে নিরাপত্তার কারণে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে পরিবারটি।
স্থানীয় সমাজের মুরব্বি ওয়াসিম ঢালী বলেন, “মিলন দীর্ঘদিন ধরে ওই নারীকে বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। তাকে একাধিকবার নিষেধ করা হয়েছে। এরপরও গত ৫ আগস্ট বাড়িতে একা পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। মেয়েটি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং গুরুতর অসুস্থ। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন সরদার বলেন, “মামলা হওয়ার পরও যদি আসামি বাইরে থেকে ভুক্তভোগী পরিবারকে হুমকি দিতে পারে, তবে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।”

ভুক্তভোগী আইরিন লাবনী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে মিলন আমাকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। রাজি না হওয়ায় বিভিন্ন সময় হুমকি দিত। ঘটনার দিন মা কাজে পাশের বাড়িতে গেলে সে ঘরে ঢুকে আমাকে জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের চেষ্টা করে। আমি চিৎকার করলে আমাকে মারধর করে চলে যায়। মামলা করার পর এখন মাকে ফোন করে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা এখন তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় আছি।”
মামলার বাদী নাজমা বেগম বলেন, “মামলা করার পর থেকে আমাদেরই পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। মামলা তুলে না নিলে হত্যার পর ঘরবাড়ি পেট্রোল বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমি আমার মেয়ের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার ও আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা চাই।”
তবে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত মিলন ঢালী গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, আইরিনের ভাইয়ের কাছে তিনি টাকা পাবেন। সেই টাকা চাইতে গিয়ে আইরিনের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। ধর্ষণচেষ্টার এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’। এ বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য নিতে তার বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এইচ এম জাকির হোসেন বলেন, “চরকুমারিয়া ইউনিয়নে ছাত্রদলের কোনো কমিটি নেই। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ কোনো অপরাধ করলে তার দায় ছাত্রদল নেবে না। কমিটি সচল থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া যেত। অপরাধীর কোনো স্থান ছাত্রদলে নেই।”
সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হোসাইন বলেন, “ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সখিপুর থানায় মামলা রুজু করা হয়েছে এবং মামলার কপি ইতিমধ্যে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামিকে গ্রেফতার করতে পুলিশের জোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। হুমকির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
