যশোরের শার্শায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মৎস্যঘেরে অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। এর সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া যোগ হওয়ায় পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে এক রাতেই বিপুলসংখ্যক মাছ মারা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দাবি, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে তাদের প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকার অন্য মাছচাষিদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) দিবাগত রাত ১টার দিকে শার্শা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়পুর-সোনামুখো বিলে এ এফ মৎস্য খামারে মাছ মারা শুরু হয়। শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে ঘেরের পানিতে বিপুলসংখ্যক মৃত মাছ ভেসে উঠতে দেখা যায়।
খামারমালিকদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘেরে অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র চালানো সম্ভব হয়নি। ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। একই সময়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মাছ মারা যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত এ এফ মৎস্য খামারটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন। তাদের দাবি, প্রায় ২০০ বিঘা আয়তনের ঘেরে ৬০ লাখ পাবদা মাছ চাষ করা হয়েছিল।
খামারমালিকদের হিসাবে, প্রতি ১৫টি পাবদা মাছের ওজন প্রায় এক কেজি ধরে মোট উৎপাদন প্রায় ১০ হাজার মণ। প্রতি মণ পাবদার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫ হাজার টাকা হিসেবে শুধু পাবদা মাছের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা। অন্যান্য প্রজাতির মাছসহ মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা বলে দাবি তাদের।
খামারমালিক আলফাজুল হক বলেন, ঘেরের মাছের বড় একটি অংশ বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছিল। বাজারজাতের পাশাপাশি কিছু মাছ ভারতে রপ্তানির প্রক্রিয়াও চলছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এই ঘটনায় শুধু মাছের ক্ষতিই নয়, বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন খামারমালিকরা। আলফাজুল হক জানান, মাছের খাবার বাবদ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার মালামাল বাকিতে নেওয়া হয়েছে। মাছ মারা যাওয়ার পর সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
অপর খামারমালিক ফারুক হোসেন বলেন, রাত ১টার পর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। সকাল হওয়ার আগেই বিপুল পরিমাণ পাবদা মাছ মারা যায়। পরে মৃত মাছ পচতে শুরু করে। তার দাবি, এই খামারের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০০ পরিবার নির্ভরশীল।
খামারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এ খামারে উৎপাদিত পাবদার একটি অংশ রপ্তানি চেইনের মাধ্যমে ভারতে যায়। ফলে মাছ মারা যাওয়ায় শুধু স্থানীয় বাজার নয়, রপ্তানি প্রক্রিয়াতেও প্রভাব পড়েছে।
সরেজমিনে ঘেরের পানিতে অসংখ্য মৃত মাছ ভেসে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও মাছ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও পরিশ্রম এক রাতের ঘটনায় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খামারমালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষিদের অভিযোগ, মাছ মারা যাওয়ার পরও শার্শা উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে খোঁজ নেননি। দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় মাছচাষিরা বলছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে বড় মাছের ঘেরগুলোতে ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে অক্সিজেন সরবরাহের আধুনিক যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ঘেরগুলোতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল করার পাশাপাশি জরুরি সময়ে বিকল্প বিদ্যুৎ ও অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও পুনর্বাসনের দাবিও উঠেছে।
বেনাপোল সাব-জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) মনজুরুল ইসলাম বলেন, সারা দেশে লোডশেডিং চলছে। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত বিরতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
তবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দিন দিন উন্নতি হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
